• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৪, শুক্রবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

ভারত হয়ে দেশে ঢুকছে ডেটা, প্রশ্নে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা”

  • প্রকাশিত ০৪:০৯ অপরাহ্ন শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২৬
ভারত হয়ে দেশে ঢুকছে ডেটা, প্রশ্নে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা”
Time Bangla news
ফজলে এলাহি সুমন সাভার প্রতিনিধি

ভারত হয়ে দেশে ঢুকছে ডেটা, প্রশ্নে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা”


বাংলাদেশের ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার একটি বড় অংশের আন্তর্জাতিক সংযোগ এখনো ভারতের ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল (আইটিসি) দিয়ে ভারত হয়ে দেশে আসছে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ। ফলে দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ডেটা যখন অন্য দেশের ভূখণ্ড অতিক্রম করছে, তখন এর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ কতটা বাংলাদেশের হাতে থাকছে?

তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত এক দশকে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে ৯৫ গুণেরও বেশি। এই বাড়তি চাহিদার বড় অংশ পূরণ হচ্ছে ভারতের আইটিসি অপারেটরদের মাধ্যমে। আর এ পথে ব্যান্ডউইথ আমদানির বিপরীতে গত আট বছরে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অর্থনৈতিক ব্যয়ের পাশাপাশি এখন সামনে এসেছে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও।

 *বিদেশি ভূখণ্ডে বাংলাদেশের ডেটা* 

ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে ডেটা কোন অবকাঠামো দিয়ে এবং কোন দেশের ভূখণ্ড অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে—তা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সরকারি যোগাযোগ, ব্যবসায়িক লেনদেন, আর্থিক কার্যক্রম এবং নাগরিকদের ডিজিটাল যোগাযোগের একটি অংশ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব ডেটা ট্রাফিকের একটি অংশ যদি দীর্ঘ সময় অন্য দেশের ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সেই দেশের আইন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভাব এড়িয়ে চলা কঠিন। ফলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ডেটার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের বক্তব্য, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন-২০০০ ও টেলিযোগাযোগ আইন-২০২৩ দেশটির নিরাপত্তা ও তদন্ত সংস্থাগুলোকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যোগাযোগ ও ডেটা-সংক্রান্ত তথ্যের ওপর আইনগত ক্ষমতা দেয়। এ কারণে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের ডেটা আদান-প্রদানের নিরাপত্তা নিয়ে নীতিগত ও কারিগরি মূল্যায়ন জরুরি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিটি ডেটা নিয়মিতভাবে নজরদারি করা হচ্ছে। বরং বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ হলো—বিদেশি ভূখণ্ড ও সেখানকার আইনগত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা নিজেই একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি করে।

‘ *ডিজিটাল সীমান্ত’ কতটা নিরাপদ?* 

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের সার্বভৌমত্ব এখন আর শুধু স্থল, জলসীমা কিংবা আকাশসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং নাগরিক সেবার বড় অংশই ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।

এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক ডেটা প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো ভবিষ্যতে কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি দেশ যদি তার গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল যোগাযোগের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অন্য রাষ্ট্রের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সংকটের সময় সেই নির্ভরতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

 *সাবমেরিন ক্যাবলেই কি সমাধান?* 

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশকে নিজস্ব আন্তর্জাতিক সংযোগের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। এর অন্যতম পথ হতে পারে সাবমেরিন ক্যাবলভিত্তিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা সম্প্রসারণ।

বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগে সাবমেরিন ক্যাবল ও স্থলভিত্তিক আইটিসি—দুই ধরনের অবকাঠামোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সংযোগকে আরও বহুমুখী করা, একাধিক বিকল্প রুট রাখা এবং কোনো একটি দেশের ভূখণ্ডের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ডেটা রুটের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, এনক্রিপশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

‘ *ডেটার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আছে’* 

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষক মাহমুদ শাহেদ বলেন, ভারতের মাধ্যমে আইটিসি দিয়ে বাংলাদেশে আসা ব্যান্ডউইথের ক্ষেত্রে ডেটা নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, “আইটিসির মাধ্যমে ভারত থেকে যে ব্যান্ডউইথ বাংলাদেশে আসছে, এই ডেটার সিকিউরিটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ ভারত তাদের টেরিটরিতে যেকোনো ডেটা ট্রাফিক নজরদারি করতে পারে। বাংলাদেশের গোপন ও স্পর্শকাতর ডেটাও এতে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।”

 *ব্যান্ডউইথের হিসাব ছাড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন* 

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার যত বাড়ছে, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। ফলে দ্রুত ও কম খরচে ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও উৎস নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি কেবল ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ কেনা বা বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাওয়ার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের স্বাধীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল সক্ষমতা।

তাই ভারতের স্থলভিত্তিক সংযোগের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল, বিকল্প আন্তর্জাতিক রুট ও শক্তিশালী দেশীয় অবকাঠামোর সমন্বয়ে একটি বহুমুখী ডিজিটাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দাবি জোরালো হচ্ছে।

কারণ ডিজিটাল যুগে সীমান্তের ভেতরে অবকাঠামো থাকলেই সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয় না; দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা কোন পথে যাচ্ছে এবং সেই পথের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—সেটিও এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সর্বশেষ