• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ৩০, বুধবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ১৫
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*চীনা বিনিয়োগে বাংলাদেশি শিল্প কতটা লাভবান হচ্ছে।*

  • প্রকাশিত ০৯:০৯ অপরাহ্ন বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
*চীনা বিনিয়োগে বাংলাদেশি শিল্প কতটা লাভবান হচ্ছে।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*চীনা বিনিয়োগে বাংলাদেশি শিল্প কতটা লাভবান হচ্ছে।* 


চীনা বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে বড় অঙ্কের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্রে রয়েছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান। বেপজার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮টি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লিজ চুক্তির বিপরীতে প্রায় ১ দশমিক ০২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা এবং ১ লাখ ৩১ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় পর্যন্ত বাস্তবে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র প্রায় ৬১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ ঘোষিত ও প্রত্যাশিত বিনিয়োগের তুলনায় বাস্তবে আসা অর্থের পরিমাণ অনেক কম। এখানেই শেষ নয়—চীনা বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল বাংলাদেশ কতটা পাচ্ছে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। এসব কারখানার সরবরাহ শৃঙ্খলে কতটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে, কতজন স্থানীয় প্রকৌশলী আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন এবং এসব বিনিয়োগ থেকে নতুন রফতানি সক্ষমতা কতটা তৈরি হচ্ছে—তার হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বিদেশি কারখানা স্থাপিত হলেই তার পুরো অর্থনৈতিক সুফল বাংলাদেশে থেকে যায় না। কারখানার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন কিংবা প্রযুক্তিগত সেবার বড় অংশ যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে আসে, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন সীমিত থাকতে পারে। বিপরীতে এসব চাহিদার একটি বড় অংশ বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান পূরণ করতে পারলে একটি বিদেশি কারখানাকে ঘিরে আরও বহু দেশীয় ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 **বিনিয়োগের অঙ্কের বাইরে আসল হিসাব* 

চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনায় সাধারণত কারখানার সংখ্যা, বিনিয়োগের ঘোষণা এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের হিসাব সামনে আসে। কিন্তু একটি বিনিয়োগ বাস্তবে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তিকে কতটা শক্তিশালী করছে, তা বোঝার জন্য আরও কিছু সূচক দেখতে হয়।

স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি কারখানার নিয়মিত সরবরাহকারী হয়েছে কি না, বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানরা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন কি না, নতুন পণ্য দেশে তৈরি হচ্ছে কি না এবং এসব পণ্য নতুন বাজারে রফতানি হচ্ছে কি না—এসবই সেই হিসাবের অংশ।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকে শুধু কারখানা স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পশ্চাৎমুখী শিল্প, উচ্চমূল্যের পণ্য এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও কোথাও পুঁজি, আবার কোথাও প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে।

 *স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কতটা সুযোগ পাচ্ছে* 

একটি বড় শিল্পকারখানা পরিচালনায় কার্টন, প্যাকেজিং, লেবেল, হ্যাঙ্গার, প্লাস্টিক সামগ্রী, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন, গুদাম, নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা ধরনের পণ্য ও সেবার প্রয়োজন হয়।

এসবের একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রভাব শুধু একটি কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তৈরি হয় স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, নতুন উদ্যোক্তা এবং অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ।

তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারী হওয়া সহজ নয়। আন্তর্জাতিক মানের সনদ, নির্দিষ্ট সময়ে বড় অর্ডার সরবরাহের সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং পর্যাপ্ত কার্যকর মূলধনের প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির আগে থেকেই নির্ধারিত আন্তর্জাতিক সরবরাহ নেটওয়ার্কও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রবেশে বাধা তৈরি করতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, মান ও সময়ের শর্ত পূরণের পাশাপাশি দেশের ব্যবসায়িক ব্যয় এবং নীতিগত জটিলতাও স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।

 *প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের প্রশ্ন* 

চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় প্রকৌশলী ও কারিগরি জনবলের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আজিজুল আকিল ডেভিড মনে করেন, বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পের চুক্তিতেই বাংলাদেশি প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান ও শ্রমিক নিয়োগের নির্দিষ্ট শর্ত থাকা প্রয়োজন।

তার মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, এসব প্রকল্পকে স্থানীয় দক্ষতা ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো দরকার। বিদেশি প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময় প্রকল্পে যুক্ত থাকলেও স্থানীয় জনবল যদি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি দায়িত্বে না আসে, তাহলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান ও দক্ষতার বড় অংশ দেশীয় অর্থনীতিতে স্থায়ী হয় না।

 *ডিজিটাল বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা* 

চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি ক্ষেত্র হচ্ছে ডিজিটাল বাণিজ্য। Alibaba.com-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারের রফতানি ব্যবসা করেছেন। বর্তমানে ৩০০টির বেশি বাংলাদেশি সরবরাহকারী স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটিতে কাজ করছে।

আগামী তিন বছরে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি রফতানিকারককে ডিজিটাল বাণিজ্যের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পণ্য প্রদর্শনের সঙ্গে নিয়মিত রফতানি ব্যবসার পার্থক্য রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং প্রক্রিয়া, অর্থ পরিশোধ এবং ছোট অর্ডারের অর্থ দ্রুত দেশে আনার মতো বিষয়গুলো ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এখনো চ্যালেঞ্জ।

 *ঘোষণা আর বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান* 

চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি হলো ঘোষিত বিনিয়োগ ও বাস্তবে আসা অর্থের পার্থক্য।

বেপজার তথ্য অনুযায়ী, ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির বিপরীতে প্রায় ১.০২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৬১.৪ মিলিয়ন ডলার।

এ কারণে বিনিয়োগের হিসাব করতে শুধু চুক্তি বা ঘোষণার অঙ্ক দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। প্রকৃত মূলধন প্রবাহ, কারখানা স্থাপন, উৎপাদন শুরু, স্থানীয় ক্রয় এবং বাস্তব কর্মসংস্থান—প্রতিটি ধাপ আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

 *জ্বালানি ও অবকাঠামোও বড় পরীক্ষা* 

বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীও বিনিয়োগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন।

কারখানা স্থাপনের পর পর্যাপ্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হয়। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই বিনিয়োগ আকর্ষণে কর সুবিধা ও প্রণোদনার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস, দ্রুত বন্দরসেবা, কার্যকর কাস্টমস এবং নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 *কারখানা কতটা ‘বাংলাদেশের’ হচ্ছে* 

শেষ পর্যন্ত চীনা বিনিয়োগের প্রভাব পরিমাপের প্রশ্নটি দাঁড়ায়—একটি কারখানা বাংলাদেশে শুধু উৎপাদন করছে, নাকি বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে?

স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সরবরাহকারী হচ্ছে কি না, বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা প্রযুক্তি আয়ত্ত করছেন কি না, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে কি না, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ছে কি না এবং নতুন রফতানি পণ্য তৈরি হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই পাওয়া যাবে বিনিয়োগের প্রকৃত প্রভাব।

কারখানার সংখ্যা কিংবা ঘোষিত বিনিয়োগের অঙ্ক তাই চূড়ান্ত হিসাব নয়। চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে কতটা স্থানীয় শিল্প, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও রফতানি সক্ষমতা রেখে যাচ্ছে—সেটিই হতে পারে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।


সর্বশেষ