• ২০২৬ অক্টোবর ০৬, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৬:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

দত্তকের আড়ালে শিশুর কেনাবেচা।*

  • প্রকাশিত ০৬:১০ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, অক্টোবর ০৬, ২০২৬
দত্তকের আড়ালে শিশুর কেনাবেচা।*
Time Bangla news
পুন:লিখনে: ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*দত্তকের আড়ালে শিশুর কেনাবেচা।* 


 *উপশিরোনাম:* ফেসবুকে প্রকাশ্য দর-কষাকষি, সক্রিয় দালালচক্র; আইনি কাঠামো ও নজরদারির ঘাটতিতে বাড়ছে ঝুঁকি। 

সন্তান লালন-পালনের জন্য বৈধভাবে দত্তক নেওয়ার সুযোগ বিশ্বের অনেক দেশেই সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য পৃথক কোনো সাধারণ দেওয়ানি দত্তক আইন না থাকায় সেই জায়গায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে শিশুর বয়স, লিঙ্গ ও অন্যান্য তথ্য দিয়ে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও চলছে অর্থের দর-কষাকষিও। এতে একদিকে নিঃসন্তান দম্পতিদের আবেগকে কেন্দ্র করে প্রতারণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিশু পাচার ও শোষণের ঝুঁকিও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে ফেসবুকে শিশু দত্তক ও কেনাবেচা-সংক্রান্ত ৩৯টি প্রকাশ্য গ্রুপের সন্ধান এবং ২৮৮টি পোস্ট পর্যালোচনার তথ্য উঠে এসেছে। এসব গ্রুপের অধিকাংশের সদস্য কয়েক শ হলেও কোনো কোনো গ্রুপে সদস্যসংখ্যা ২০ হাজারের কাছাকাছি। অর্থাৎ বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ নয় এই কার্যক্রম। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট এক নারী দালালের বক্তব্যে জানা যায়, বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের খোঁজা হয়, যারা কোনো কারণে সন্তানকে নিজেদের কাছে রাখতে চান না। এরপর সন্তান জন্মের আগ পর্যন্ত ওই নারীদের দেখভাল এবং পরবর্তী সময়ে শিশুকে অন্যের কাছে দেওয়ার জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে।

তবে এ ধরনের ঘটনায় জড়িত সবাই যে পেশাদার দালাল, এমনটিও নয়। কোথাও দরিদ্র বা অসহায় অভিভাবক, কোথাও আবার শিশুর দায়িত্ব নিতে আগ্রহী পরিবার—বিভিন্ন পক্ষ নানা কারণে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে। এর সুযোগে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, একটি শিশু কার কাছে যাচ্ছে, তার ভবিষ্যৎ কী হচ্ছে কিংবা তাকে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে কার্যকর রাষ্ট্রীয় নজরদারি নেই।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে অনৈতিক বা বেআইনি উদ্দেশ্যে শিশু কেনাবেচার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। মানব পাচারসংক্রান্ত আইনেও অসৎ উদ্দেশ্যে দত্তক গ্রহণকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে—অনেক সময় শিশু হস্তান্তরের দুই পক্ষই এতে সম্মত থাকে। ফলে কোনো অভিযোগকারী পাওয়া যায় না। অভিযোগ না থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি সামনে আসে না।

এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে শিশু কেনাবেচার বিজ্ঞাপন বা পোস্ট চলতে থাকা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোরও এখানে দায়িত্ব রয়েছে। শিশু বিক্রি, অবৈধ দত্তক বা পাচারের সুযোগ তৈরি করে এমন গ্রুপ ও কনটেন্ট শনাক্ত করে দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগির ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও অনলাইনে শিশু কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু কোনো অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য কার্যক্রম নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের জন্য একটি অভিন্ন ও সুস্পষ্ট দেওয়ানি দত্তকব্যবস্থা চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। আদালতের অনুমোদন ও তদারকি, দত্তকগ্রহীতার যথাযথ যাচাই, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিটি দত্তক প্রক্রিয়ার তথ্য সংরক্ষণের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

দেশে সন্তানহীন বহু পরিবার একটি শিশুকে নিজেদের পরিবারে বড় করার সুযোগ খুঁজছে। অন্যদিকে অসংখ্য এতিম, পরিত্যক্ত ও অসহায় শিশু নিরাপদ পরিবার ও ভবিষ্যতের অপেক্ষায় রয়েছে। তাই অনিয়ন্ত্রিত ও গোপন হস্তান্তরের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় তদারকিতে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত দত্তকব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।

শিশুর পরিচয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কোনোভাবেই অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত হতে পারে না। তাই দত্তকের নামে শিশুর বেচাকেনা বন্ধে বিদ্যমান আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, ডিজিটাল নজরদারি এবং শিশু সুরক্ষায় সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।


সর্বশেষ