*প্রবৃদ্ধি থমকে, দারিদ্র্যতা বাড়ে—ব্যাংকেও বিপদ।*
**উপশিরোনাম:* প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে ; খেলাপি ঋণ ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ, দারিদ্র্যসীমার নিচে নতুন ২১ লাখ মানুষ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমার পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য এবং ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ব্যাংক খাত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজস্ব বৃদ্ধি ও সুশাসন জোরদারকে অর্থনীতির জন্য জরুরি সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
*প্রবৃদ্ধিতে বড় ধাক্কা*
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে।
বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। পাশাপাশি রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
*দারিদ্র্যতা বাড়ছে*
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এতে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে ওই সীমার নিচে নেমেছে।
জাতীয় দারিদ্র্যের হারও ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে গত অর্থবছরে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
*ব্যাংক খাতে বাড়ছে ঝুঁকি*
অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগ এখন ব্যাংক খাত। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যায়, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১০ শতাংশ। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানতবিহীন তারল্য সহায়তাও জুনে ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
*বেসরকারি ঋণেও সংকট*
জুনে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও কমে গিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
*রেমিট্যান্সে রেকর্ড, বিনিয়োগে মন্দা*
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে রপ্তানি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমেছে এবং নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
*সামনেও থাকবে চাপ*
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। পরের অর্থবছরে তা ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। একই সময়ে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশের ওপরে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করাতে বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংস্কার, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর-রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। সাধারণ ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোরও সুপারিশ করা হয়েছে।
মতামত দিন