• ২০২৬ অক্টোবর ০৬, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

নদীতে ফেলা প্লাস্টিক ফিরছে মানুষের খাবারে।*

  • প্রকাশিত ০৮:১০ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, অক্টোবর ০৬, ২০২৬
নদীতে ফেলা প্লাস্টিক ফিরছে মানুষের খাবারে।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*নদীতে ফেলা প্লাস্টিক ফিরছে মানুষের খাবারে।* 


 *উপশিরোনাম:* বুড়িগঙ্গার তলদেশে ১৫ ফুট গভীরেও মিলছে পুরোনো প্লাস্টিক; মাছ-কাঁকড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত; সিসা, আর্সেনিকসহ ভারী ধাতুর উপস্থিতিও মিলেছে গবেষণায়, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি।

ঢাকার প্রাণপ্রবাহ বুড়িগঙ্গা এখন শুধু শিল্পবর্জ্য কিংবা নোংরা পানির দূষণে বিপর্যস্ত নয়; নদীর তলদেশ পর্যন্ত জমছে প্লাস্টিক বর্জ্য। বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক সামগ্রী বছরের পর বছর নদীতে জমে থাকায় দূষণের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে নৌচলাচল, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য ও মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলেও।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) ২০২২ সালের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। উৎপাদন ও ব্যবহারের পর এসব বর্জ্যের বড় একটি অংশ যথাযথ ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে নদী-খাল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বুড়িগঙ্গার মাটির প্রায় ১৫ ফুট গভীরেও প্লাস্টিক বর্জ্যের সন্ধান মিলেছে। গবেষকদের মতে, সেখানে পাওয়া কিছু বোতলের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছর হলেও সেগুলোর অবস্থা প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণা এখনো চলমান।

 *শত বছরেও মিলিয়ে যাচ্ছে না প্লাস্টিক* 

প্লাস্টিকের অন্যতম উপাদান পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট বা পিইটি পরিবেশে সহজে ভাঙে না। গবেষণা অনুযায়ী, এ ধরনের প্লাস্টিক সম্পূর্ণ ক্ষয়ে যেতে প্রায় ৪৫০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে অবস্থান করার সময় এটি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বাড়ায়।

বুড়িগঙ্গার দূষণের প্রভাব ইতোমধ্যে খাদ্যশৃঙ্খলেও পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় নদীর মাছ, কাঁকড়া ও তলানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। মাছের প্রতি গ্রামে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৮২টি এবং কাঁকড়ার প্রতি গ্রামে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছিল। নদীর তলানিতেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়।

গবেষণায় সিসা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতিও উঠে আসে।

 *নদী থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে* 

২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বঙ্গোপসাগরের মাছের তুলনায় বুড়িগঙ্গা থেকে সংগ্রহ করা মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে ফেলা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ড. শফি মোহাম্মদ তারেকের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার কারণে মাছ, লবণ, তেল ও চিনিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হচ্ছে।

তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। সাম্প্রতিক গবেষণায় এর সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে প্রজনন, পরিপাক ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

 *বাড়ছে উৎপাদন, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা* 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬ হাজারের বেশি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। এ খাতে কর্মরত প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। শিল্পটির প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ বলে সরকারি বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়েছে। ঢাকায় প্রতিদিন উৎপন্ন হয়েছে প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য।

এসডোর হিসাবে, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত নর্দমা, খাল ও নদীতে গিয়ে জমা হচ্ছে।

 *বর্জ্যে বন্ধ হচ্ছে নর্দমা,ভরাট হচ্ছে খাল-নদী, বাড়ছে জলাবদ্ধতা* 

রাজধানীর জলাবদ্ধতার সঙ্গেও প্লাস্টিক বর্জ্যের সম্পর্ক রয়েছে। পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও বিভিন্ন প্যাকেজিং সামগ্রী নর্দমায় আটকে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত করে।

২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নর্দমার প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। কিন্তু পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর কিছুদিন পরই বিভিন্ন এলাকায় আবারও নর্দমা প্লাস্টিক বর্জ্যে আটকে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, সুন্দরবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতেও প্লাস্টিক দূষণ বাড়ছে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে প্রতি লিটারে গড়ে ২৩ দশমিক ২৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। গবেষণায় পিইটি প্লাস্টিককে অন্যতম প্রধান দূষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 *আইন আছে, প্রয়োগ কতটা?* 

বাংলাদেশ ২০০২ সালে পলিথিন শপিংব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। পরবর্তী সময়ে নদী ও নদীতীরে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ, বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং নদী থেকে বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে হাইকোর্ট বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী ইসলামবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় জমে থাকা প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, আইন ও আদালতের নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। ফলে নদী দূষণের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

 *লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি* 

জাতীয় টেকসই প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য ছিল। ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ৯০ শতাংশ পর্যায়ক্রমে বন্ধ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই প্লাস্টিক দূষণ কমবে না। উৎপাদন পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা, বর্জ্য সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ এবং আইন প্রয়োগ—সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এসডোর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেনের মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য থেকে দূষণ তৈরি হচ্ছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ পরিষ্কারের ব্যয়ের একটি অংশ তাদের বহন করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

প্লাস্টিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত না হলেও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং বিকল্প ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে পারলে নদী ও জলাভূমিতে প্লাস্টিকের চাপ কমানো সম্ভব।

অন্যথায় নদীর পানিতে জমতে থাকা প্লাস্টিক শুধু পরিবেশের সংকট হয়েই থাকবে না—তা ক্রমেই মানুষের খাদ্যশৃঙ্খল ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।

সর্বশেষ