**হাম নিয়ন্ত্রণে বড় টিকাদান, তবু হাজার প্রাণহানি—গলদ কোথায়?*
দেশে হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি কর্মসূচিতে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেয়া হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু থামেনি। ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম-সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত ১০০ জন এবং সন্দেহভাজন ৯০৯ জন। একই সময়ে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেয়া হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় কর্মসূচির পরও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আসছে না কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু টিকার সংখ্যা নয়; কোন শিশুরা বাদ পড়ছে, তা শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্গম এলাকা, দরিদ্র ও চলমান জনগোষ্ঠীর অনেক শিশু নিয়মিত কর্মসূচির বাইরে থেকে যেতে পারে।
*লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণেই বড় ফাঁক*
হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকাদানের কভারেজ কমেছে। ২০২৩ সালে প্রথম ডোজের হার ২০১৯ সালের ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়; দ্বিতীয় ডোজ ৮৯ শতাংশ থেকে কমে হয় ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ।
কোভিড-১৯-এর সময় টিকাদান ব্যাহত হওয়া, টিকা নিয়ে অনীহা ও ভুল তথ্যের বিস্তার এ ঘাটতির কারণ। দীর্ঘদিন জাতীয় পর্যায়ে সম্পূরক কর্মসূচি না থাকায় বাদ পড়া শিশুর সংখ্যাও বেড়েছে।
*দুই কর্মসূচিতে ৬০ লাখ শিশুর পার্থক্য*
জরুরি কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়। ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। অথচ দুই মাস পর ভিটামিন এ কর্মসূচিতে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করা হয়—ব্যবধান প্রায় ৬০ লাখ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি জনসংখ্যাভিত্তিক হিসাবের দুর্বলতার ইঙ্গিত। প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণে জাতীয় হিসাবের পাশাপাশি স্থানীয় শিশুসংখ্যা, দুর্গম এলাকা ও মানুষের চলাচল বিবেচনা করা জরুরি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, জাতীয় গড় দিয়ে সাফল্য বিচার করলে প্রকৃত চিত্র আড়ালে থাকে। প্রতিটি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত করে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে।
*টিকাদানের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা*
নিয়মিত সূচির টিকা পাওয়ার আগেই অনেক শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হচ্ছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ৩ হাজার ১৬৭ জন সন্দেহভাজন ও ৫৩৭ জন পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী ভর্তি হয়। মোট ৫৭টি মৃত্যুও নথিভুক্ত হয়েছে।
মৃত শিশুদের ৮৬ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ মাসের কম; ৩১ জনের বয়স নয় মাসেরও কম। নিহত ৫৭ শিশুর ৪৭ জন কোনো হাম টিকা পায়নি। ৫০টি ঘটনায় নিউমোনিয়াকে প্রধান জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বা অন্য অসুস্থতার সঙ্গে হাম যুক্ত হলে অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়।
*টিকা কর্মসূচির প্রভাব আছে, তবে ঘাটতিও রয়ে গেছে*
চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালে হাম রোগীর ভর্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় কমেছে, যা জরুরি কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত। তবে নতুন রোগী আসা বন্ধ হয়নি।
শরীয়তপুরের এক বছর বয়সী সাইফ হাসান টিকা নেয়ার কয়েক দিনের মধ্যে জ্বর ও ফুসকুড়িতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। চিকিৎসকদের ধারণা, টিকার সুরক্ষা তৈরি হওয়ার আগেই সে সংক্রমিত হয়েছিল। আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগায় হাম তার অবস্থাকে আরও জটিল করে।
*সামনে আবারও টিকাদানের প্রস্তুতি*
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন টিকাদান কর্মসূচি শুরুর প্রস্তুতি চলছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এবার শুধু বড় লক্ষ্যমাত্রা নয়—কোন এলাকায় কত শিশু বাদ পড়েছে, তাদের বয়স ও অবস্থান কী, তা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
দীর্ঘদিন ঘাটতিতে থাকা এলাকায় প্রয়োজনে নিয়মিত বয়সসীমার বাইরের শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা, বাড়তি নজরদারি ও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক। তাই জাতীয় হার সন্তোষজনক হলেও স্থানীয়ভাবে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেশি থাকলে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকেই যায়। এর মূল্য দিচ্ছে সবচেয়ে ছোট শিশুরা। কিশোরগঞ্জের নয় মাস বয়সী মোস্তাকিম কোনো হাম-রুবেলা টিকা পাওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়ে ৩০ আগস্ট ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মারা যায়। তার মৃত্যু আবারও প্রশ্ন তোলে—টিকা পৌঁছানোর পরও যারা বাদ পড়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছাবে কবে?
মতামত দিন