আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৭: ১৬
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একটি রিসোর্ট ভবন।
কক্সবাজারে অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট উচ্ছেদে বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিনে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি চারতলা রিসোর্ট ভবন। এটি প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল বলে দাবি ভবনমালিকের।
আজ সোমবার দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় অবস্থিত ভবনটিতে অভিযান চালানো হয়। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নেতৃত্বে অভিযানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনী অংশ নেয়।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ইনানীর নৌবাহিনীর জেটির পূর্ব পাশে তারকা হোটেল রয়েল টিউলিপ। উত্তর পাশে রয়েছে আরেক তারকা হোটেলে বে ওয়াচ। দুই তারকা হোটেলের মধ্যভাগে অবস্থিত চারতলা রিসোর্ট ভবনটি।
বেলা ১১টার দিকে রিসোর্ট ভবনটির সামনে উচ্ছেদ অভিযানের জন্য খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর) নিয়ে আসা হয়। উপস্থিত হন শ্রমিকেরাও। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা সেখানে ভিড় করতে শুরু করেন। দুপুরে ভবনের নিচে এবং দুই পাশে থাকা ১০-১২টি দোকানঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর চারতলা ভবনের কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়। তারপর মূল ভবনের পিলার ভাঙার কাজ শুরু হয়।
১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লেগে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর মেরিন ড্র্রাইভ সড়কের পাশে কউকের অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে যত্রতত্র হোটেল-রিসোর্ট গড়ে তোলার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।
অভিযান চলাকালে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) কর্মকর্তারা জানান, অবৈধভাবে নির্মিত চারতলা রিসোর্ট ভবনটি নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলতে মালিকপক্ষকে চারবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নোটিশের পর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই রিসোর্ট ভবনটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে থাকা রিসোর্ট ভবনটির মালিক শহিদুল হক বলেন, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিয়ে ভবনটির নির্মাণ শুরু হয়। সম্প্রতি ভবনের নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের থাকার জন্য বেশ কয়েকটি কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছিল। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মিত ভবনটি কিছুদিনের মধ্যে উদ্বোধনের কথা। তবে এর আগেই এটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। নোটিশের জবাব না দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শহিদুল হক বলেন, ‘চারটি নোটিশেরই জবাব দিয়েছি। ভবন নির্মাণের বিপরীতে কাগজপত্রও আছে, কিন্তু কেউ তা আমলে নিচ্ছে না।’
১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লেগে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর মেরিন ড্র্রাইভ সড়কের পাশে কউকের অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে যত্রতত্র হোটেল-রিসোর্ট গড়ে তোলার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ৮০ কিলোমিটারের মেরিন ড্রাইভে ২০০টির মতো রিসোর্ট-কটেজ-রেস্তোরাঁ রয়েছে। বেশির ভাগ কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি। কোনোটিরই অনুমোদন নেই। সম্প্রতি এসব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে কউকের পক্ষ থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বারবার নোটিশ করার পরও অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে না নেওয়ার যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে অবৈধ কোনো স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না।
৮০ কিলোমিটারে মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে রিসোর্ট-কটেজসহ স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। যে কারণে মেরিন ড্রাইভের শতাধিক রিসোর্ট-কটেজ-রেস্তোরাঁ কউকের অনুমোদন পায়নি।
—মো. আ. মান্নান, জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার
মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৭০০টির মতো নকশা অনুমোদন করা হয়েছে। ৮০ কিলোমিটারের মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ। তারপরও ইতিমধ্যে আড়াই হাজারের মতো স্থাপনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট-কটেজ গড়ে উঠেছে। তারকা মানের কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগেরই বৈধ অনুমোদন নেই।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ৮০ কিলোমিটারে মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে রিসোর্ট-কটেজসহ স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। যে কারণে মেরিন ড্রাইভের শতাধিক রিসোর্ট-কটেজ-রেস্তোরাঁ কউকের অনুমোদন পায়নি।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘কউকের অনুমোদন না পেলে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি একাধিক দপ্তরের অনুমতি পায় না। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা অবৈধ রিসোর্ট-কটেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাগজপত্র যাচাই করছি। পাশাপাশি অবৈধভাবে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হচ্ছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে কিছু কাগজপত্র আছে, কিছু নেই—তাঁদের অনুমোদনপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য ব্যবসায়ীরা ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।
উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভে ব্যাঙের ছাতার মতো বেশ কিছু রিসোর্ট-কটেজ নির্মিত হয়েছে। আমরাও চাই অবৈধ হোটেল-রিসোর্টগুলোকে আইনের আওতায় আসুক। কারণ, টুপটাপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে পর্যটকের প্রাণহানি ঘটনায় কক্সবাজারে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।’
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনা করায় সম্প্রতি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশের জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা ঘোষণা করে সরকার।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, কক্সবাজারে তাঁদের সমিতিতে সদস্যসংখ্যা ১৮৭। সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায়ই হোটেল-গেস্টহাউসের অনুমোদন রয়েছে। বাকিগুলোর কাগজপত্র আছে কি না, তাঁর জানা নেই।
মতামত দিন