• ২০২৬ অক্টোবর ২৭, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ কার্তিক ১২
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি-২ *প্লাস্টিকের নিচে চাপা পড়ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি।

  • প্রকাশিত ০১:১০ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি-২   *প্লাস্টিকের নিচে চাপা পড়ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি।
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

ঝুঁকিতে প্রাণ-প্রকৃতি-২

 *প্লাস্টিকের নিচে চাপা পড়ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি।*


 *উপশিরোনাম:* সুন্দরবনে প্লাস্টিকের থাবা, বিপন্ন শ্বাসমূল ও নতুন চারা। পানি-মাটি থেকে প্রাণীদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, বর্জ্য   অপসারণে হিমশিম বন বিভাগ। 

সুন্দরবনের মাটিতে জমছে প্লাস্টিক বর্জ্য, বিপর্যস্ত হচ্ছে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ। পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল ও দড়িতে ঢেকে যাচ্ছে গাছের গোড়া ও শ্বাসমূল। কোথাও এসব বর্জ্যে আটকে পড়ছে নতুন চারা। অন্যদিকে, বনের পানি, মাটি ও জলজ প্রাণীর দেহে মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। বিশাল বনাঞ্চল থেকে এই বর্জ্য অপসারণে জনবলসংকটে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ।

সুন্দরবনের কটকা, কচিখালী, জামতলা, ডিমের চর ও আন্ধারমানিকসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গাছের গোড়া, শ্বাসমূলের চারপাশ ও বনের মাটিতে প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকতে দেখা গেছে। ডিমের চরে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা উদ্ভিদের বীজের সঙ্গে জমেছে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক। এতে নতুন চারার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাগেরহাটের শরণখোলা ও বরগুনার পাথরঘাটার কয়েকজন বনজীবী নাহিদ ইসলাম, রাজ্জাক বিশ্বাস ও রমেশ মণ্ডল জানান, প্লাস্টিক বর্জ্য বেশি জমে থাকা এলাকায় আগের তুলনায় কাঁকড়া, শামুক ও তলদেশে বসবাসকারী অন্যান্য প্রাণীর বিচরণ কম দেখা যাচ্ছে। তাঁদের ধারণা, বর্জ্যের কারণে এসব প্রাণীর কিছু অংশ অন্যত্র সরে যাচ্ছে। পরিত্যক্ত জাল ও প্লাস্টিকের দড়ি চারার সঙ্গে জড়িয়ে থাকায় গাছের বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে এসব প্রাণীর বিচরণ কমে যাওয়ার পেছনে প্লাস্টিক দূষণের ভূমিকা কতটা, তা নিশ্চিত হতে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

 *শ্বাসমূল ঢেকে গেলে বাড়ে বিপদের আশঙ্কা* 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ও গবেষক শেখ তারেক আরাফাত বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় গাছের জন্য সংকট তৈরি করছে। ম্যানগ্রোভ বনের মাটিতে লবণাক্ততা বেশি থাকায় গাছের অক্সিজেন গ্রহণে শ্বাসমূল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব শ্বাসমূল প্লাস্টিকে ঢেকে গেলে গাছের পুষ্টি গ্রহণ ও বৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

তিনি বলেন, বড় প্লাস্টিক বর্জ্য সময়ের সঙ্গে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাটিতে মিশে যায়। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক কাঁকড়া, শামুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করতে পারে। এতে প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 *বিদেশি গবেষণাতেও ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ* 

ম্যানগ্রোভ বনে প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২১ সালে সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের উত্তর উপকূলের একটি গবেষণায় ম্যানগ্রোভ গাছের শ্বাসমূলের এলাকা বিভিন্ন মাত্রায় প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সম্পূর্ণ প্লাস্টিকে ঢাকা গাছের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়; কিছু গাছ মারাও যায়। মাটিতে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং গাছের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে বাধাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন গবেষকেরা।

২০২৪ সালে মেরিন পলিউশন বুলেটিন-এ প্রকাশিত শ্রীলংকার নেগোম্বো লেগুনের ম্যানগ্রোভ বনবিষয়ক গবেষণাতেও সামুদ্রিক বর্জ্যে দূষিত এলাকার সঙ্গে গাছের চারা, ডালপালা ও বাকলের শারীরিক ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া যায়।

তবে বিদেশের এসব গবেষণার ফলাফল সুন্দরবনের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। এখানকার গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ওপর প্লাস্টিক দূষণের সুনির্দিষ্ট প্রভাব নির্ধারণে স্থানীয় পর্যায়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

 *পানি-মাটি ও মাছের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক* 

সুন্দরবনের জলজ পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে একাধিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

২০২২ সালে সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরের প্রাণীর দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় প্রাথমিক ভোক্তা প্রাণীতে গড়ে প্রতি প্রাণীতে ০.৫৬টি এবং খাদ্যজালের চতুর্থ স্তরের ভোক্তা প্রাণীতে গড়ে ৪.১৭টি কণা পাওয়া যায়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় সুন্দরবনের ছয়টি স্থানের নমুনায় প্রতি লিটার পানিতে গড়ে ২.২২টি এবং প্রতি কেজি মাটিতে ৭৩৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় সুন্দরবন ও পশ্চিম উপকূলের নদী-খাল থেকে সংগ্রহ করা আট প্রজাতির ৬৪টি মাছের প্রতিটির পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়। প্রতি মাছে গড়ে ৭.১টি কণা পাওয়া যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. গওসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী বলেন, প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব বনের বাস্তুতন্ত্রে পড়তে পারে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বিভিন্ন প্রাণীর দেহে প্রবেশ করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে আরও সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন তো একটাই। এটি নষ্ট হলে বিকল্প কোনো অপশন নেই আমাদের।’

 *বিশাল বনে বর্জ্য অপসারণে সীমাবদ্ধতা* 

শরণখোলার বাসিন্দা তুহিন বয়াতি বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ করা না গেলে সুন্দরবনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য বন বিভাগের কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া এবং প্রয়োজনে প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণ করা জরুরি।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বন বিভাগে জনবলসংকট রয়েছে। বনরক্ষীদের ১৪০টি পদ শূন্য থাকায় দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যেও নিয়মিত প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে বাগেরহাট ও খুলনায় নেওয়া হয়। কিন্তু সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় জমে থাকা বর্জ্যের তুলনায় অপসারণের পরিমাণ খুবই কম।

তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বনের ভেতরে না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বনপ্রহরীরাও নিয়মিত তল্লাশি করছেন। তবে সাগর ও নদী থেকে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য সুন্দরবনের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুন্দরবনের শ্বাসমূল ও নতুন চারার ওপর প্লাস্টিক দূষণের প্রকৃত প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ, গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফল বলছে, এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর

সর্বশেষ