• ২০২৬ অক্টোবর ২৭, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ কার্তিক ১২
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*টি-শার্ট থেকে ওয়েডিং গাউন, বিশ্ববাজারে বদলে যাচ্ছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’।*

  • প্রকাশিত ০৭:১০ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
*টি-শার্ট থেকে ওয়েডিং গাউন, বিশ্ববাজারে বদলে যাচ্ছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*টি-শার্ট থেকে ওয়েডিং গাউন, বিশ্ববাজারে বদলে যাচ্ছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’।* 

*উপশিরোনাম:* 

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের বাড়তি কার্যাদেশে স্যুট, ব্লেজার ও বিশেষায়িত পোশাকে জোর দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। সাধারণ পোশাকের তুলনায় বেশি মূল্য ও মুনাফার সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষতা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে ধীরে ধীরে বদল আসছে। কম দামের টি-শার্ট, ট্রাউজার ও সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি এখন স্যুট, ব্লেজার, বিয়ের পোশাক, উন্নতমানের জ্যাকেট এবং বিশেষায়িত পোশাক তৈরি করছে দেশের কারখানাগুলো। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ বাড়ায় উচ্চমূল্যের পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে উন্নতমানের পোশাক কেনা শুরু করেছে। জার্মানির হারকো ও বেস্টসেলার গ্রুপের মালিকানাধীন স্পেনভিত্তিক ব্র্যান্ড বালমোহকের মতো প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের কারখানায় পোশাক তৈরির কার্যাদেশ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া এনগেলবার্ট স্ট্রাস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট, মন্টবেল, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট ও ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাকও সরাসরি অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক শেখ মুস্তাফিজের ভাষ্য, গত পাঁচ বছরে উচ্চমূল্যের পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত অন্তত ২০টি নতুন ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে কার্যাদেশ দেওয়া শুরু করেছে।

 *রপ্তানিতে বাড়ছে উচ্চমূল্যের পোশাকের হিস্যা* 

উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানি নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে এ ধরনের পণ্যের অংশ বর্তমানে প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমানের মতে, এক দশক আগে দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩ শতাংশ ছিল প্রিমিয়াম পণ্য। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হয়েছে।

বিজিএমইএ পরিচালক শেখ মুস্তাফিজ জানিয়েছেন, এক দশক আগে বাংলাদেশ প্রায় ২০০ কোটি ডলারের উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করত। বর্তমানে এ আয় ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আউটারওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো উন্নত পোশাক ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে একই শ্রেণির পণ্যের সম্মিলিত হিস্যা ছিল ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পোশাক হিসেবে ধরলে রপ্তানির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন থেকে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার। এটি হিসাবভিত্তিক অনুমান, স্বতন্ত্র সরকারি পরিসংখ্যান নয়।

 *স্যুট-ব্লেজার ও বিয়ের পোশাকে বাড়ছে সক্ষমতা* 

টিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফোরএ ইয়ার্ন ডাইংয়ের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান আসিফ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ১২ কোটি ডলারের জ্যাকেট ও আউটারওয়্যার রপ্তানি করে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম পণ্য। টমি হিলফিগার, কেলভিন ক্লেইন, কারহার্ট ও মন্টবেলের মতো ব্র্যান্ডের জন্যও পোশাক তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।

আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড বিয়ের পোশাক তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি আয় ৫০ লাখ ডলারের বেশি ছিল। এসব পোশাকের আন্তর্জাতিক খুচরামূল্য ৪০০ থেকে এক হাজার ডলারের মধ্যে।

এনার্জি প্যাক ফ্যাশনস লিমিটেডের চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশীদের ভাষ্য, তাদের প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ডলার। এর প্রায় ৯০ শতাংশ স্যুট ও ব্লেজারের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য। কোনো কোনো ব্লেজারের আন্তর্জাতিক খুচরামূল্য ৯০০ ইউরো পর্যন্ত।

তবে বিদেশি বাজারে এসব পোশাকের খুচরামূল্য আর বাংলাদেশের কারখানা থেকে রপ্তানিমূল্য এক নয়।

 *কেন উচ্চমূল্যের পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা?* 

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও সাধারণ পোশাকে মুনাফার সংকোচন উদ্যোক্তাদের উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে।

অনন্ত গার্মেন্টসের পরিচালক রিজওয়ান জাহির খানের মতে, সাধারণ পোশাকে ২ থেকে ৩ শতাংশ মুনাফা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপরীতে, উচ্চমানের প্রিমিয়াম পোশাকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি মুনাফার সুযোগ রয়েছে।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় শুধু সাধারণ পোশাকের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হচ্ছে। উন্নতমানের পোশাকের কার্যাদেশে তুলনামূলক ভালো মূল্য পাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়।

তবে এসব পণ্যে বেশি মুনাফার সম্ভাবনা থাকলেও তা উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের মান ও ক্রেতার শর্তের ওপর নির্ভরশীল।

 *সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ* 

চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র তৈরিতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশও উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজারে অংশ বাড়াতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ এখনো মূলত কম দামের পোশাকের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই ধারণা পরিবর্তনের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, উন্নত উৎপাদনপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।

প্রচলিত পোশাকের বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি উন্নতমানের পণ্যে রপ্তানি বাড়ানোই এখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে বড় লক্ষ্য। এ পরিবর্তন সফল হলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পের মুনাফা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

সর্বশেষ