*এক লাখ ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ, অভিযুক্ত এসআইকে পুরস্কৃত করলেন এসপি।*
*উপশিরোনাম:* দেড় লাখ পিস উদ্ধারের দাবি, মামলায় জব্দ দেখানো ৫০ হাজার; অভিযোগ তদন্তের আগেই পুরস্কার দেওয়ায় প্রশ্নের মুখে পুলিশের ভূমিকা।
কক্সবাজারের উখিয়ায় অভিযানে দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি উঠলেও মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার পিস। বাকি এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাৎ করে মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগটি নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে নগদ অর্থ পুরস্কার দিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ এন এম সাজেদুর রহমান। এতে পুলিশের জবাবদিহি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকা থেকে ছৈয়দুল বশর ওরফে সিসি বশরকে আটক করে পুলিশ। এসআই গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করা হয়।
অভিযোগকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী সরওয়ার সিকদারের ভাষ্য, অভিযানে মোট দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু এসআই কিবরিয়াকে বাদী করে দায়ের করা মামলার এজাহারে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়। তাঁর অভিযোগ, বাকি এক লাখ পিস ইয়াবা সরিয়ে নিয়ে পরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করা হয়।
সরওয়ারের দাবি, আটকের পর ছৈয়দুল বশরকে প্রথমে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ি এবং পরে উখিয়া থানায় নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বালুখালীর জোড়াব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়।
মামলার এজাহারে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা দেলোয়ার ও সাদ্দাম দাবি করেছেন, তাঁরা পুলিশের অভিযান কিংবা ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়ে কিছুই জানেন না। এমনকি মামলায় তাঁদের সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও অবগত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
*অভিযোগের দিনই পুরস্কার*
গত রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যেই উখিয়া থানায় গিয়ে এসআই গোলাম কিবরিয়ার হাতে নগদ অর্থ পুরস্কার তুলে দেন পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান। একই ঘটনায় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও (ওসি) পুরস্কৃত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার ও একজনকে গ্রেপ্তারের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সাধারণত মাসিক সভায় মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করা হয়। তবে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করায় সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী মাসিক সভায় এ ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। তবে অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসার পর পুরস্কার দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে। ফুটেজ, জব্দতালিকা, মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা হলে প্রকৃতপক্ষে কত পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল, তা নির্ধারণ করা সম্ভব।
*আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন*
এদিকে কক্সবাজারে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের দায়িত্ব পালন নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে অপরাধ বৃদ্ধি, পুলিশি তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রতিবেদনে দেওয়া জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে কক্সবাজারে ৯৫টি খুন, ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দেড় শতাধিক মামলা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক পিস্তল প্রদর্শন করে একজন বিচারককে ভয় দেখান। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট এক বিচারক। চলতি বছরের ২৪ মে আদালত প্রাঙ্গণে গোলাগুলির ঘটনায় দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৪ মার্চ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিহতের পরিবারের অনাস্থার পর আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তর করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গত ২২ এপ্রিল খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধু হত্যাকাণ্ডের পর সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের দাবি, বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানানো হলেও তিনি প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
*পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও অসন্তোষের অভিযোগ*
জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, বদলি, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) ও সার্ভিস বুকে বিরূপ মন্তব্যের ভয় দেখানোর কারণে বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে সম্প্রতি ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাতজন পরিদর্শক, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই ও ৩৪ জন কনস্টেবল রয়েছেন।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জেলার বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের হেফাজত থেকে ইয়াবা গায়েব হওয়ার অভিযোগ উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
*তদন্তের আশ্বাস ডিআইজির*
ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, তিনি আগে ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তবে অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়নি। তবে অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার ঘটনা স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে। স্থানীয়দের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দতালিকা, মামলার নথি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে।
তথ্যসূত্র: আমার দেশ (২৭.১০.২০২৬)।
মতামত দিন