• ২০২৬ নভেম্বর ০৫, বৃহস্পতিবার, ১৪৩৩ কার্তিক ২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:১১ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

২১ মামলার পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আস্তানায় সরকারি কর্মকর্তা, নিবন্ধন করলেন ৭৪ দলিল।*

  • প্রকাশিত ০৫:১১ অপরাহ্ন বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ০৫, ২০২৬
২১ মামলার পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আস্তানায় সরকারি কর্মকর্তা, নিবন্ধন করলেন ৭৪ দলিল।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*২১ মামলার পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আস্তানায় সরকারি কর্মকর্তা, নিবন্ধন করলেন ৭৪ দলিল।* 


 *উপশিরোনাম:* জঙ্গল সলিমপুরে পলাতক ইয়াসিনের  ইয়াসিনের জমি বিক্রিতে সরকারি সহযোগিতা, দুই দফায় নিবন্ধন ৭৪ দলিল। অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত।

পুলিশের খাতায় পলাতক, হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ ২০টির বেশি মামলার আসামি। অথচ সেই শীর্ষ সন্ত্রাসীর গোপন আস্তানায় গিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় ৭৪টি জমির বিক্রয় দলিল নিবন্ধন করে দিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা। ঘটনাটি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরের।

অভিযুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিনের নামে থাকা ২৭৫ শতক জমির এসব দলিল দুই দফায় নিবন্ধন করেন সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। গত ১৭ সেপ্টেম্বর একদিনেই ৬৫টি এবং ১ অক্টোবর আরও নয়টি দলিল নিবন্ধন করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রচলিত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর গত ২৮ অক্টোবর সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এর আগে ২৬ অক্টোবর দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে রায়হান হাবীবকেও বদলি করা হয়েছিল। তবে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকার নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে ছিল ইয়াসিন ও তার বাহিনীর হাতে। তিনি র‌্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি। হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ তার বিরুদ্ধে রয়েছে ২১টি মামলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী।

 *যেভাবে হলো ৭৪ দলিল নিবন্ধন* 

সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জমিগুলোর দলিল নিবন্ধনের জন্য কমিশনের মাধ্যমে আবেদন করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন। আবেদনে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষ অসুস্থ থাকায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে না পারার কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর কমিশন টিম নিয়ে ইয়াসিনের আস্তানায় যান সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব।

সেখানে গিয়ে প্রথম দফায় ৬৫টি এবং দ্বিতীয় দফায় আরও নয়টি দলিল নিবন্ধন করা হয়। পুরো কার্যক্রমে সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে অফিসের কর্মচারী করিম, সিরাজউদ্দিন, তুষার ও রতনও ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুই দফার কাজই সম্পন্ন হয় সন্ধ্যার পর।

বাংলাদেশের রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৩৮ ধারা অনুযায়ী, শারীরিক অক্ষমতা, গুরুতর অসুস্থতা, কারাবাস কিংবা বৈধ কোনো কারণে দলিলদাতা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে না পারলে কমিশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। সাব-রেজিস্ট্রার সন্তুষ্ট হলে কমিশনার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট স্থানে পাঠান। সেখানে দলিলদাতার পরিচয় ও সম্মতি নিশ্চিত করে স্বাক্ষর বা টিপসই নেওয়া এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।

তবে ইয়াসিনের জমির দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন, কমিশনের মাধ্যমে একসঙ্গে তিনটির বেশি দলিল নিবন্ধনের সুযোগ নেই। অথচ একদিনেই ৬৫টি দলিল নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছে। কীভাবে এতগুলো দলিল নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হলো এবং কোন বিধিতে তা সম্পন্ন হয়েছে, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

 *দলিলের মূল্য ২ কোটি ৮৭ লাখ, বাজারমূল্য ১০ কোটির বেশি* 

নিবন্ধন করা ৭৪টি দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। সে হিসাবে দলিলে দেখানো মূল্য ও সম্ভাব্য বাজারমূল্যের ব্যবধান ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকারও বেশি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, কয়েক বছর আগেও ঝুট মিলের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা ইয়াসিন কীভাবে জঙ্গল সলিমপুরের বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হলেন?

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব জমির বড় অংশ ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দখলে ছিল। লিংক রোডের আশপাশে প্রতি শতক জমি ৯ থেকে ১০ লাখ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে এলাকাটির জমির বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। অভিযানের পর সেখানে র‌্যাব ও পুলিশের দুটি পৃথক নিরাপত্তাচৌকিও স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এলাকাটিতে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা চলছে।

 *বদলির আদেশের পরও নিবন্ধন* 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৬ অক্টোবর দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। তাদের ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। এর মধ্যেই ইয়াসিনের জমির দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি সামনে আসে। প্রথম দফার ৬৫টি দলিলের খবর জানাজানি হওয়ার পরও ১ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় আরও নয়টি দলিল নিবন্ধন করা হয়।

এদিকে গত ২৪ আগস্ট ইয়াসিন এসব জমির ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বি বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থাকলে মালিকানা অনুযায়ী যে কেউ খাজনা দিতে পারেন। জমির দলিল হস্তান্তরের সঙ্গে ভূমি অফিসের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

 *যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রশাসন* 

ইয়াসিনের আস্তানায় গিয়ে দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী সিরাজউদ্দিন। তিনি বলেন, ভাটিয়ারি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জায়গাটি একটি আস্তানার মতো মনে হয়েছে। তবে সেটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান তাঁর মনে নেই।

সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব এর আগে ২৮ অক্টোবর বলেছিলেন, ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী জমিগুলো ইয়াসিনের নামে নামজারি করা ছিল এবং তিনি খাজনাও পরিশোধ করেছেন। আইনজীবী নাজিম উদ্দিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করায় সেগুলো যাচাই করে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে প্রশাসনের তৎপরতা ও সংবাদ প্রকাশের পরও কীভাবে দলিল নিবন্ধন করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে রায়হান হাবীব বলেছিলেন, তাঁদের কাছে এ বিষয়ে বিশেষ কোনো নির্দেশনা ছিল না। কাগজপত্র ঠিক থাকায় আইন মেনেই নিবন্ধন করা হয়েছে।

তবে দ্বিতীয় দফায় নিবন্ধন করা নয়টি দলিলের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ২৮ অক্টোবর বিষয়টি জানার পর আইন মন্ত্রণালয়কে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। সীতাকুণ্ডের ইউএনও সাব-রেজিস্ট্রারকে ডেকে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে রায়হান হাবীব দাবি করেছেন, ইয়াসিন নিজে উপস্থিত না হলেও কাগজপত্র নিয়ে আবেদন করায় বিধি অনুযায়ী দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ইয়াসিন হত্যা মামলার আসামি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এমন একজন ব্যক্তির বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কেন অবগত ছিলেন না, সেটিও খতিয়ে দেখা উৎসব জমি নিবন্ধনের বিষয়ে পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সর্বশেষ