• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৪, শুক্রবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:০৯ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

আপনি ৪ রুমের একটি বাড়ির মালিক হলে কি করবেন ?

  • প্রকাশিত ০৫:০৯ অপরাহ্ন শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২৬
আপনি ৪ রুমের একটি বাড়ির মালিক হলে কি করবেন ?
Time Bangla news
মিজানুর রহমান কুমিল্লা জেলা চিফ প্রতিনিধি

ধরুন, আপনি ৪ রুমের একটি বাড়ির মালিক, যার ছাদ আছে ১২০০ স্কয়ার ফিট। বাড়িতে ৪ জন সদস্যের জন্য লাইট, ফ্যান, পানির মোটর ও ফ্রিজ সহ দৈনিক গড়ে ১৫ ইউনিট (মাসিক প্রায় ৪৫০ ইউনিট) বিদ্যুতের প্রয়োজন। এই ১৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আপনাকে প্রাথমিক অবস্থায় একটি ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার অন-গ্রিড সোলার সিস্টেম বসাতে হবে, যার আনুমানিক প্রারম্ভিক অবকাঠামোগত খরচ অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। 

আর যদি সরকারের কাছে আপনি বিদ্যুৎ বিক্রি করতে চান, উদাহরণস্বরূপ আপনি প্রতিদিন ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করবেন, তবে আপনাকে দৈনিক মোট ২৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ আপনার নিজস্ব ব্যবহার ও বিক্রির চাহিদা মিলিয়ে সোলার সিস্টেমের ক্ষমতা বাড়িয়ে অন্তত ১০ কিলোওয়াটে নিয়ে যেতে হবে এবং সাথে যোগ করতে হবে উচ্চ ক্ষমতার ব্যাটারি ব্যাংক। এই ক্ষেত্রে বর্তমান বাজারদরে আপনার প্রাথমিক মূলধনী বিনিয়োগ এক লাফে পৌছে যাবে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ থেকে ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা অনুযায়ী, বাসাবাড়ি বা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে গ্রাহক যদি নিজেদের চাহিদার উদ্বৃত্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেন, তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য তাঁকে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে অর্থ প্রদান করবে সরকার। 

প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ৮ টাকা ধরে তার ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১.২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে এই দর নির্ধারণ করা হয়েছে। শর্ত একটাই, ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাটারিসহ এই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপন সম্পন্ন করতে হবে এবং এই সুবিধা পাওয়া যাবে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ ঠিক তিন বছরের জন্য। 

আপাতদৃষ্টিতে সবুজ শক্তি উৎসাহিত করার এই উদ্যোগকে বৈপ্লবিক মনে হলেও, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য ও মূলধনী ফাঁদ।

কাগজে-কলমে এই রূপরেখা দেখলে যে কারও মনে হতে পারে, বাংলাদেশ অবশেষে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার নতুন যুগে প্রবেশ করছে। যে দেশে আমদানিকৃত জ্বালানি, কয়লা, প্রিমিয়াম তেল ও এলএনজির বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি সামলাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ খাত বিপুল ভর্তুকির চাপে পিষ্ট, সেখানে ছাদের অব্যবহৃত ফাঁকা জায়গায় সূর্যালোক ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত সমাধান মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

তবে রাজনৈতিক ঘোষণা আর প্রজ্ঞাপনের চটকদার কথার আড়ালে বাজার বাস্তবতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার যে রূপ লুকিয়ে আছে, তা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এটি একটি চরম অপরিপক্ক ও অপরিকল্পিত উদ্যোগ। বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকা নীতি-নির্ধারকদের কষা এই অংকটি শেষ পর্যন্ত জাতীয় বিদ্যুৎ খাত এবং সাধারণ গ্রাহক উভয় পক্ষের জন্যই নতুন এক গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেবে।

যেকোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য নির্ভর করে তার সার্বজনীনতা এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারের ওপর। তাই গোড়াতেই যে প্রশ্নটি তোলা দরকার, তা হলো ঠিক কত টাকার নগদ মূলধন থাকলে একজন সাধারণ নাগরিক সরকারের কাছে এই ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ বিক্রির যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন?

বাস্তব চিত্রটি বুঝতে হলে বর্তমান খোলা বাজারের আমদানিকৃত সোলার যন্ত্রাংশের সঠিক মূল্য ও কারিগরি বিন্যাস দেখা প্রয়োজন। সাধারণ চার রুমের একটি পরিবার যেখানে দৈনিক ১৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে, তাদের ৫ কিলোওয়াটের সোলার সিস্টেমের সরঞ্জামভিত্তিক খরচের প্রাথমিক খতিয়ান নিম্নরূপ:

সোলার প্যানেল (Mono PERC / N-Type TopCon): ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার জন্য ১০ থেকে ১২টি উচ্চ-দক্ষতার প্যানেল প্রয়োজন। প্রতি ওয়াটের বর্তমান বাজারদর ২১ থেকে ২৩ টাকা। ফলে কেবল প্যানেলের পিছনেই খরচ হবে ১ লাখ ১৫  হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা।

ইনভার্টার (Hybrid/On-Grid Inverter): ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি উন্নত মানের ইউরোপীয় বা চীনা ব্র্যান্ডের ইনভার্টারের সর্বনিম্ন বাজারমূল্য  হাজার থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা।

মাউন্টিং স্ট্রাকচার, বিশেষ সোলার ক্যাবল ও এক্সেসরিজ: অ্যালুমিনিয়াম বা জিআই স্ট্রাকচার, ডাবল ইনসুলেটেড ক্যাবল, প্রটেকশন বক্স, স্পিড অ্যারোস্টার ও আর্থিং মিলিয়ে খরচ হয় অন্তত ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা।

ইনস্টলেশন ও নেট মিটারিং ফি: মজুরি, ওয়্যারিং এবং বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির অনুমোদিত নেট মিটারিং সেটআপের খরচ প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা।

অর্থাৎ, কোনো ব্যাটারি ছাড়া শুধুমাত্র নিজের বাড়ির চাহিদা মেটানোর মতো অন-গ্রিড সোলার বসাতেই প্রারম্ভিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

এবার আসা যাক সরকারের কাছে দৈনিক ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করার মূল শর্তে। 

প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, সাড়ে ১০ টাকা প্রিমিয়াম মূল্য কেবল তাঁদেরকেই দেওয়া হবে, যাঁরা ব্যাটারিসহ সিস্টেম স্থাপন করবেন। 

কারণ নীতি-নির্ধারকেরা ভেবেছেন যে দিনে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা রেখে বিকালের পর বা সন্ধ্যার পিক-আওয়ারে তা গ্রিডে সরবরাহ করতে হবে।

দৈনিক ১০ ইউনিট বাড়তি বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হলে পুরো সিস্টেমের ক্ষমতা ৫ কিলোওয়াট থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১০ কিলোওয়াটে নিয়ে যেতে হবে। এর বাজার হিসাব দাঁড়ায়:

১০ কিলোওয়াট সোলার প্যানেল ও ১০ কিলোওয়াট হাইব্রিড ইনভার্টার: আনুমানিক ৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

ব্যাটারি ব্যাংক (Lithium Iron Phosphate - LiFePO4): বিকালের পর ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ জমা রেখে গ্রিডে পাঠাতে এবং ব্যাটারির নিরাপদ কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে অন্তত ১৫ থেকে ২০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা ধারণক্ষমতার লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যাংক লাগবে। বর্তমানে লিথিয়াম ব্যাটারির প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টার বাজারমূল্য ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা। ফলে ১৫-২০ kWh ব্যাটারি ব্যাংকের পিছনেই এককালীন খরচ হবে ৫ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

কাঠামো, ক্যাবলিং ও অতিরিক্ত ইনস্টলেশন: অন্তত ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে, নিজের বাড়ির ১৫ ইউনিট চাহিদা মিটিয়ে সরকারের কাছে দৈনিক ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ সাড়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি করতে গেলে একজন সাধারণ নাগরিককে প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরিতেই এককালীন বিনিয়োগ করতে হবে সর্বনিম্ন ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা।

এখন হিসাব করা যাক, ১০ লাখ টাকা এককালীন বিনিয়োগ করে সাড়ে ১০ টাকা দরে দৈনিক ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করলে একজন গ্রাহকের প্রকৃতপক্ষে কত টাকা লাভ হবে?

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গ্রাহক প্রতিদিন ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রিডে দিলে প্রতি ইউনিটে পাবেন ১০ টাকা ৫০ পয়সা।

দৈনিক আয়: ১০ ইউনিট × ১০.৫০ টাকা = ১০৫ টাকা।

মাসিক আয়: ১০৫ টাকা × ৩০ দিন = ৩,১৫০ টাকা।

বার্ষিক আয়: ৩,১৫০ টাকা × ১২ মাস = ৩৭,৮০০ টাকা।

সরকার ঘোষিত এই বিশেষ মূল্য গ্যারান্টি কার্যকর থাকবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ ঠিক ৩ বছর।

৩ বছরে বিদ্যুৎ বিক্রির মোট আয়: ৩৭,৮০০ টাকা × ৩ বছর = ১,১৩,৪০০ টাকা।

এর সাথে যদি যোগ করা হয় যে, নিজের বাড়ির ১৫ ইউনিট বিদ্যুৎ সোলার থেকে পাওয়া যাবে, ফলে ডিপিডিসি বা আরইবি-র গ্রিড বিল বাবদ প্রতি মাসে সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা সাশ্রয় হবে, তবে ৩ বছরে বিদ্যুতের বিল সাশ্রয় হবে প্রায় ১,৩৫,০০০ টাকা।

অতএব, বিক্রির আয় ও নিজস্ব বিল সাশ্রয় মিলিয়ে ৩ বছরে মোট প্রাপ্তি দাঁড়াবে আনুমানিক (১,১৩,৪০০ + ১,৩৫,০০০) = ২,৪৮,৪০০ টাকা।

কিন্তু এখানেই ঘুপচি মেরে আছে মূলধনী খরচের মারাত্মক ফাঁদ। সোলার প্যানেলের আয়ু ২৫ বছর বলা হলেও, সোলার ব্যাটারির আয়ু অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। বাংলাদেশের উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শিল্পমানের লিথিয়াম ব্যাটারি সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ বছর কার্যকর থাকে। চার-পাঁচ বছর পার হলেই ব্যাটারির চার্জ ধারণক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং পুরো ব্যাটারি ব্যাংকটি বদলে ফেলতে হয়।

১০ কিলোওয়াট সিস্টেমের যে ব্যাটারি ব্যাংক কিনতে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, চার থেকে পাঁচ বছর পর সেটি পুনরায় নতুন করে কিনতে আবার অন্তত ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পকেট থেকে ঢালতে হবে। 

অথচ ৩ বছর পর (২০৩০ সালের পর) সরকার আর সাড়ে ১০ টাকা প্রিমিয়াম দেবে না, তখন বিদ্যুৎ কেনা হবে সাধারণ পাইকারি দরে, যা হয়তো ইউনিট প্রতি ৬ থেকে ৭ টাকায় নেমে আসবে।

এখানে অর্থনৈতিক সমীকরণটি একদম পরিষ্কার। 

গ্রাহক ৩ বছরে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় করলেন ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, অথচ ৪-৫ বছর পর তাঁকে ব্যাটারি বদলাতেই খরচ করতে হবে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। ফলে দেখা যাচ্ছে, এই ব্যবসায়িক মডেলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন তোলাই অসম্ভব। এটি গ্রাহকের জন্য এক বিশাল ঘাটতির ব্যবসা।

অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য ও সামাজিক বৈষম্য

এই গাণিতিক হিসাবই প্রমাণ করে যে সরকারের এই সৌরবিদ্যুৎ নীতিটি সাধারণ মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথে সঙ্গতিহীন। নীতি প্রণয়নের সময় আমলা ও প্রকৌশলীরা যে প্রিমিয়াম হিসাব করেছেন, সেখানে ব্যাটারির অবচয় খরচ এবং পুনঃস্থাপন ব্যয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।

যে সাধারণ মধ্যবিত্ত নাগরিক প্রতি মাসের ৩-৪ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল দিতে হিমশিম খান, তাঁর পক্ষে এককালীন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা সোলার প্রকল্পে বিনিয়োগ করা অসম্ভব স্বপ্ন। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সোলার প্যানেল বা ব্যাটারি বন্ধক রেখে সাধারণ নাগরিককে সহজ শর্তে ঋণ দেয় না। ব্যাংকগুলোর দৃষ্টিতে ছাদে বসানো সোলার সিস্টেমের জামানতমূল্য প্রায় শূন্য।

এর ফলে সরকারের এই সাড়ে ১০ টাকার প্রিমিয়াম সুবিধার সুফল ভোগ করবে কেবল দেশের অতি-উচ্চবিত্ত শ্রেণী এবং বড় বড় শিল্পকারখানার মালিকেরা। 

তৈরি পোশাক খাত বা বড় শিল্পগ্রুপগুলোর নিজস্ব বিশালাকার মূলধন রয়েছে, তারা কারখানার কয়েক একর বিস্তৃত ছাদ ব্যবহার করে মেঘা-সিস্টেম বসিয়ে কাস্টমস ও বিদ্যুৎ অফিসের জটিলতা ডিঙ্গিয়ে এই সুবিধা নিতে পারবে। কিন্তু সাধারণ নাগরিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর নামে যে সোলার বিপ্লবের প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা মূলত বাস্তবতাহীন একটি প্রলোভন।

এদিকে প্রকল্পটির অপরিপক্কতার আরেকটি ক্ষেত্র হলো নীতিগত সমন্বয়হীনতা। একদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে আমদানিতে শুল্ক ও কর মওকুফ করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস কর্মকর্তা ও ফিল্ড অফিসারদের কাছে এই নীতিমালার প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অতীতে দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য শক্তির যন্ত্রাংশের সুনির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে কাস্টমস হাউসে মাসের পর মাস চালান আটকে থাকে। ইনভার্টার, স্মার্ট মিটার কিংবা বিশেষ ক্যাবলকে সাধারণ ইলেকট্রনিক্স পণ্য হিসেবে গণ্য করে চড়া শুল্ক ও ভ্যাট দাবি করা হয়। 

বিদ্যুৎ বিভাগ যখন পরিবেশবান্ধব শক্তির প্রচার করে, এনবিআর তখন কাস্টমস থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যস্ত থাকে। 

দুই সরকারি সংস্থার এই টানাটানিতে পড়ে যে সকল সাধারণ উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে বা ব্যক্তিগত সঞ্চয় ভেঙ্গে সোলার সরঞ্জাম আমদানি করেন, তাঁদের কাস্টমস হাউসে জরিমানা গুনে কিংবা বন্দর ডেমারেজ দিয়ে সর্বশান্ত হতে হয়। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে অবকাঠামো চালুর যে কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে, কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই সময়ের মধ্যে প্রজেক্ট চালুই করা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

তবে শুধুমাত্র অর্থায়ন বা রাজস্ব নীতির অসামঞ্জস্যই একমাত্র বাধা নয়। সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত সংকট অপেক্ষা করছে আমাদের জাতীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ভিতরে। 

আর এটিকেই বলা যায় সরকারের এই উদ্যোগের মূল কারিগরি গলার কাঁটা।

ধরা যাক, সরকারের এই সাড়ে ১০ টাকার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের নানা প্রান্তের ভবনের মালিক ও শিল্পকারখানা মিলিয়ে হাজার হাজার গ্রাহক ব্যাটারিসহ সোলার সিস্টেম বসালেন। এর ফলে দিনের বেলা শত শত মেগাওয়াট অত্যন্ত পরিবর্তনশীল  সৌরবিদ্যুৎ স্থানীয় বিতরণ লাইনে উল্টো অভিমুখে প্রবেশ করতে শুরু করবে।

কিন্তু আমাদের দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর (যেমন ডিপিডিসি, ডেসকো, আরইবি) বিদ্যমান সাব-স্টেশন এবং স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমারগুলো কি এই রিভার্স পাওয়ার ফ্লো সামাল দেওয়ার মতো প্রযুক্তিতে প্রস্তুত?

আমাদের বেশিরভাগ আঞ্চলিক সাব-স্টেশন এখনো পুরোনো ম্যানুয়াল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে চলে। আধুনিক 'স্মার্ট গ্রিড', স্বয়ংক্রিয় ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচিং কিংবা ডিজিটাল লোড ব্যালান্সিং অবকাঠামো ছাড়া হঠাৎ করে হাজার হাজার ছোট ছোট উৎস থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া শুরু করলে স্থানীয় ভোল্টেজ ট্রিপ করবে, ট্রান্সফরমার পুড়ে যাবে এবং সাব-স্টেশন বিকল হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে।

আবার সূর্যালোক কোনো স্থির শক্তি নয়। আকাশে মেঘ দেখা দিলে বা হঠাৎ বৃষ্টি নামলে বিদ্যুতের উৎপাদন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নেমে যায়। গ্রিডে যখন আকস্মিকভাবে এই ঘাটতি তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়ার মতো ফ্লেক্সিবল জেনারেশন প্লান্ট আমাদের দেশে পর্যাপ্ত নেই। 

ফলে বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না করে স্রেফ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রিডে বিপুল সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার এই চেষ্টা পুরো জাতীয় গ্রিডকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

এর পাশাপাশি বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ডিপিডিসি বা আরইবি-র মূল আয় আসে সাধারণ গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। এখন গ্রাহক যদি নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে উল্টো বিতরণ কোম্পানির কাছে ১০ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করতে শুরু করে, তবে কোম্পানিগুলোর নিয়মিত আয়ে টান পড়বে। 

ফলে বাস্তবে দেখা যায়, স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসগুলো নেট মিটারিং ব্যবস্থার অনুমোদন দিতে চরম অনীহা প্রকাশ করে। একটি নেট মিটার অনুমোদনের জন্য এবং গ্রিড টেস্ট নিশ্চিত করতে একজন সাধারণ গ্রাহককে যে পরিমাণ আমলাতান্ত্রিক হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়, তাতে প্রাথমিক উৎসাহ ক্ষণিকের মধ্যেই উবে যায়। 

ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারের কথা প্রজ্ঞাপনে লেখা থাকলেও field-level এর আমলাতন্ত্র ও বিতরণ কর্মকর্তাদের পুরনো মানসিকতা রাতারাতি বদলে যাওয়া কঠিন।

সুতরাং বলা যায়, সাড়ে ১০ টাকার হিসাব বসিয়ে সোলার বিপ্লবের প্রচারণা চালানো সহজ, কিন্তু বাস্তব অবকাঠামোগত ভিত্তি না গড়ে এবং এর পিছনে থাকা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার ও ব্যাটারি পরিবর্তনের বিশাল খরচের হিসাব আড়াল করে এগোতে গেলে এই প্রজ্ঞাপনটি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে হতাশ করবে এবং জাতীয় গ্রিডকে এক অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে। 

নিজস্ব প্রতিবেদক, টাইম বাংলা নিউজ 

সর্বশেষ