• ২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৮, মঙ্গলবার, ১৪৩৩ ভাদ্র ২৪
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৯ পূর্বাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

প্রধান শিক্ষক নেই ৩৬ হাজার প্রাথমিক স্কুলে*

  • প্রকাশিত ১১:০৯ পূর্বাহ্ন মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৬
প্রধান শিক্ষক নেই ৩৬ হাজার  প্রাথমিক স্কুলে*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ

*প্রধান শিক্ষক নেই ৩৬ হাজার  প্রাথমিক স্কুলে* 


 *৫৬ হাজারের বেশি পদ শূন্য, দুই শিক্ষকেই চলছে কোথাও পাঁচ শ্রেণি* 


দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেমে এসেছে বড় ধরনের সংকট। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষক পদও খালি রয়েছে ২০ হাজারের বেশি। ফলে কোথাও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে বছরের পর বছর চলছে প্রশাসনিক কাজ, আবার কোথাও মাত্র দুজন শিক্ষককে সামলাতে হচ্ছে পাঁচটি শ্রেণি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১টি। এর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৬ জন। অর্থাৎ মোট ৫৬ হাজার ৩৯৫টি পদ শূন্য।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র প্রধান শিক্ষক পদে। অনুমোদিত ৬৫ হাজার ৫০২টি পদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি এখনো খালি। অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষক পদেই কেউ নেই। গত বছরের জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ৩৪ হাজার ১০৬। এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পদ বেড়েছে আরও ২ হাজার ১২৯টি।

 *এক শিক্ষক, একাধিক শ্রেণি* 

শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান। একজন শিক্ষককে একই সময়ে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। কোনো কোনো স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষক। প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে তার নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পয়েস্তির চর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র দুজন। একজন আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।

ফলে পাঁচটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হচ্ছে এই দুই শিক্ষককে। একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে বাইরে গেলে অনেক সময় পাঠদান কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

 *শিক্ষক কমছে, শিক্ষার্থীও হারাচ্ছে* 

শিক্ষক সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ময়মনসিংহের ২ হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৪২টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ ৮৫৩টি।

২০২৫ সালে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। মাত্র এক বছরে ঝরে গেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ শিক্ষার্থী।

 *সর্বত্রই সংকট* 

দেশের বিভিন্ন জেলাতেও একই চিত্র। বগুড়ায় ৮০৯টি, খুলনায় ৬০৫টি, গাজীপুরে ২৯৩টি, নারায়ণগঞ্জে ৩৪৩টি, ফরিদপুরে ৫১৫টি, রাজবাড়ীতে ২৭৯টি এবং বান্দরবানে ১৭৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।

রাজশাহীতে ৫৮৯টি এবং রংপুরে ৬৬৯টি বিদ্যালয়ে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকের পদ। বরিশাল বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক। একই বিভাগে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ ৩ হাজার ২৯টি।

 *থমকে যাচ্ছে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম* 

প্রধান শিক্ষক না থাকায় শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমই নয়, অনেক বিদ্যালয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও নিয়মিত বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে না। কোথাও আবার দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে না।

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে অনেক বিদ্যালয় ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহে। এর বিপরীতে বেসরকারি ভালো বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে প্রতিযোগিতা।


‘ *শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই হবে না’* 


ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, শিশুর শিক্ষার মূল ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক পর্যায়ে। তাই এ স্তরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।


তাঁর মতে, শুধু শূন্য পদ পূরণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন এবং তাদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন—এমন মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন-সুবিধা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


 *৮০ শতাংশ পদোন্নতিতে, ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ* 


প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণে ৮০ শতাংশ পদোন্নতি এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।


মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) মো. লাল হোসেন বলেন, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মাঠপর্যায়ে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পদোন্নতি দেওয়া হবে।


 *অক্টোবরে আসছেন ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষক* 


এদিকে সহকারী শিক্ষক পদে নতুন করে নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর তাদের যোগদানের কথা রয়েছে।


একই সঙ্গে দীর্ঘ চাকরির অভিজ্ঞতা থাকা যোগ্য সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য গ্রেডেশন তালিকা তৈরি হচ্ছে। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা সফটওয়্যারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অভিযোগ ও আপত্তি নিষ্পত্তির পর তালিকা পিএসসিতে পাঠানো হবে।


 *আইনি জট খুললেও সংকট কাটেনি* 


সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতায় আটকে ছিল। গত জুলাইয়ে এ বিষয়ে আদালতের রায়ের পর সেই জটিলতা অনেকটাই কেটেছে বলে জানিয়েছে সরকার।


প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক পদে বিপুলসংখ্যক শূন্যতা রয়েছে। আইনি জটিলতা দূর হওয়ায় এখন দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পর সহকারী শিক্ষক পদে যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটিও দ্রুত পূরণ করা হবে।


 *নতুন শিক্ষক না আসা পর্যন্ত বদলি বন্ধ* 


নতুন নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষকের পদায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।


নতুন শিক্ষকদের কর্মস্থলে যোগদান শেষ হলে বদলি কার্যক্রম ফের চালু করার কথা রয়েছে। তবে তখন বর্তমান নীতিমালা বহাল থাকবে, নাকি নতুন কোনো পদ্ধতি আসবে

—সে সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে।


 *প্রাথমিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরেই যখন ৩৬ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য, তখন প্রশ্ন উঠছে—এভাবে আর কতদিন চলবে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা?* শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও।

সর্বশেষ