• ২০২৬ অক্টোবর ০৪, রবিবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৬:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

*প্রাণীর মৃত্যু-চুরি ও অনুপযুক্ত আবাসন, প্রশ্নের মুখে গাজীপুর সাফারি পার্কের ব্যবস্থাপনা ।*

  • প্রকাশিত ০৬:১০ অপরাহ্ন রবিবার, অক্টোবর ০৪, ২০২৬
*প্রাণীর মৃত্যু-চুরি ও অনুপযুক্ত আবাসন, প্রশ্নের মুখে গাজীপুর সাফারি পার্কের ব্যবস্থাপনা ।*
Time Bangla news
ফজলে এলাহী সুমন | সাভার প্রতিনিধি | টাইম বাংলা নিউজ।

*প্রাণীর মৃত্যু-চুরি ও অনুপযুক্ত আবাসন, প্রশ্নের মুখে গাজীপুর সাফারি পার্কের ব্যবস্থাপনা ।* 


বিশ্ব প্রাণী দিবসে প্রাণীর অধিকার, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের অন্যতম বৃহৎ গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রাণী ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। বছরের পর বছর ধরে প্রাণীর মৃত্যু, চুরি ও পাচার এবং উদ্ধার করা প্রাণীদের দীর্ঘদিন সংকীর্ণ পরিবেশে রাখার অভিযোগে পার্কটির ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা সাফারি পার্কটি একসময় দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের আদলে তৈরি এ পার্কে ২০১৩ সালে ৭৩ প্রজাতির প্রায় দেড় হাজার প্রাণী নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল খোলা পরিবেশে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ দেখার সুযোগ তৈরি করা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে পার্কটির প্রাণী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, জনবল ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে অভিযোগ বাড়তে থাকে। গত কয়েক বছরে একাধিক মূল্যবান প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি ঘটেছে প্রাণী চুরি ও পাচারের ঘটনাও। উদ্ধার করা প্রাণীদের একটি অংশকে দীর্ঘ সময় কোয়ারেন্টাইনের নামে ছোট পরিসরের আবাসনে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

 **হারিয়েছে জেব্রা, জিরাফ, বাঘ-সিংহ* 

পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মাত্র দুই মাসে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহীর মৃত্যু হয়। এর আগে মারা যায় একটি হাতি। চলতি বছরের ৬ ও ৭ আগস্ট আরও দুটি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

পার্কে একসময় ছিল ১২টি জিরাফ। বিদেশ থেকে আনা এসব জিরাফের চারটি বাচ্চাও জন্ম নেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সবগুলোই মারা যায়। ২০২৫ সালে সর্বশেষ জিরাফটির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পার্কটি জিরাফশূন্য হয়ে পড়ে।

একই পরিণতি হয়েছে ক্যাঙ্গারুদেরও। ২০১৩ সালে তিনটি ক্যাঙ্গারু আনা হয়েছিল। ২০১৭ সালে একটি বাচ্চা জন্ম নিলেও পরবর্তী সময়ে সব ক্যাঙ্গারুই মারা যায়।

 *নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন* 

শুধু প্রাণীর মৃত্যু নয়, পার্কের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। ২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর সাফারি কিংডম এলাকা থেকে দুটি গ্রিন উইং ম্যাকাও চুরি হয়। একটি উদ্ধার হলেও ঘটনার পুরো রহস্য এখনো পরিষ্কার নয়।

এরপর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি একটি নীলগাই নিখোঁজ হয়। একই বছরের মার্চে তিনটি রিং-টেইলড লেমুর চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটে। তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, লেমুরগুলো সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাচার করা হয়েছে।

এর আগে বিমানবন্দরে পাচারের সময় উদ্ধার করা লেমুরসহ বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণী ২০১৮ সালে সাফারি পার্কে আনা হয়েছিল। পার্কে একটি লেমুরের বাচ্চাও জন্ম নেয়। পরে একটি মারা যায়। তিনটি লেমুর চুরির পর পার্কটি কার্যত লেমুরশূন্য হয়ে পড়ে। পরে ঢাকার শ্যামবাজার থেকে একটি পুরুষ লেমুর উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্য দুটির সন্ধান মেলেনি।

লেমুর চুরির ঘটনায় পার্কের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এক নিকটাত্মীয়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি পার্কে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত ছিলেন।

বারবার এমন ঘটনার পর প্রাণীর পরিচয় ও মালিকানা শনাক্তকরণ আরও শক্তিশালী করতে মাইক্রোচিপ স্থাপন এবং ডিএনএ প্রোফাইল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এ কাজ বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী।

 *নয় বছর ধরে ছোট আবাসনে দুই লেপার্ড* 

প্রাণী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে দুটি লেপার্ডের বিষয়টি। পাচারের সময় উদ্ধার করা প্রাণী দুটিকে নিয়ম অনুযায়ী অল্প সময়ের জন্য কোয়ারেন্টাইনে রাখার কথা থাকলেও প্রায় নয় বছর ধরে তারা একই ধরনের সংকীর্ণ আবাসনে রয়েছে বলে অভিযোগ।

সম্প্রতি পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিনিধি দল পার্ক পরিদর্শন করে তাদের আবাসন ও চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানায়।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, লেপার্ডের জন্য এমন পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে পর্যাপ্ত উচ্চতা, আলো ও চলাচলের সুযোগ থাকবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে থাকা বর্তমান আবাসন তাদের স্বাভাবিক আচরণের উপযোগী নয়। প্রাণী দুটির ইউরিনেশনের সমস্যাও রয়েছে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত না হলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তবে সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন সংকীর্ণ স্থানে থাকা লেপার্ড দুটির জন্য আধা-প্রাকৃতিক আবাসন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 *১৩ ভালুক নিয়েও উদ্বেগ* 

কোয়ারেন্টাইন এলাকায় থাকা ১৩টি ভালুকের অবস্থাও সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ করেছে অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির দাবি, প্রাণীগুলোকে পর্যাপ্ত জায়গা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দেওয়া হচ্ছে না। ছোট ও স্যাঁতসেঁতে সেলে রাখার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।

হাতির ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, হাতিগুলোকে দীর্ঘ সময় শেকলে বেঁধে রাখা হয় এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয় না।

এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগকে একাধিকবার জানানো হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। চলতি বছরের ২০ জুন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগকে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়। তবে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

 *রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও বেহাল দশা* 

সাফারি পার্কের ব্যবস্থাপনায় আর্থিক বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর মূল ফটকসহ বিভিন্ন ইভেন্ট ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থা করা হলেও বন বিভাগের প্রায় আট কোটি টাকা ইজারা বকেয়া রয়েছে বলে জানা গেছে। পাওনা আদায়ে মামলা করার পর কার্যকর অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে

মূল ফটক ও কোর সাফারি ইজারা দিয়ে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ থাকলেও করোনা মহামারির পর থেকে কাঙ্ক্ষিত ইজারাদার পাওয়া যাচ্ছে না বলে বন বিভাগ জানিয়েছে। ফলে পার্কের কিছু কার্যক্রম কর্তৃপক্ষকেই পরিচালনা করতে হচ্ছে।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, এত বিশাল আয়তনের পার্ক অল্প জনবল দিয়ে পরিচালনা করা কঠিন। ইজারাদার পাওয়া গেলে ব্যবস্থাপনার চাপ কিছুটা কমবে।

বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি। গত ৫ আগস্টের পর পার্কের বিভিন্ন স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনাতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে বন বিভাগের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

প্রাণী দিবসের আলোচনায় যখন প্রাণীর নিরাপদ আবাস, অধিকার ও কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন গাজীপুর সাফারি পার্কের একের পর এক প্রাণীর মৃত্যু, চুরি, দীর্ঘ বন্দিজীবন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার অভিযোগ প্রশ্ন তুলছে—বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য তৈরি এই বিশাল পার্কে প্রাণীদের জন্য আদৌ কতটা নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে।

সর্বশেষ