• ২০২৬ অক্টোবর ০৭, বুধবার, ১৪৩৩ আশ্বিন ২২
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৪:১০ অপরাহ্ন
English
পরিচালনাপর্ষদ
আমাদের সাথে থাকুন আপনি ও ... www.timebanglanews.com

ঢাকার ৯৮ সচল বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি ফ্র্যাঞ্চাইজি রুটের পরিকল্পনা, ‘এক রুট এক কোম্পানি’ মডেল”।

  • প্রকাশিত ০৪:১০ অপরাহ্ন বুধবার, অক্টোবর ০৭, ২০২৬
ঢাকার ৯৮ সচল বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি ফ্র্যাঞ্চাইজি রুটের পরিকল্পনা, ‘এক রুট এক কোম্পানি’ মডেল”।
Time Bangla news
বিশেষ প্রতিনিধি | শোয়েব বিন মুসা| ৭ অক্টোবর ২০২৬

“ঢাকার ৯৮ সচল বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি ফ্র্যাঞ্চাইজি রুটের পরিকল্পনা, ‘এক রুট এক কোম্পানি’ মডেল”।


রাজধানীর দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি প্রধান রুটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের পরিবর্তে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ভিত্তিতে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। 

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ—ডিটিসিএ (DTCA)-এর বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩২টি রুট এখনো চূড়ান্ত নয়; সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে রুট ও পরিচালন কাঠামোয় পরিবর্তন হতে পারে। 

৪১৮ অনুমোদিত রুট, বাস্তবে চলছে মাত্র ৯৮টি

তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, ঢাকায় অনুমোদিত বাস রুটের সংখ্যা প্রায় ৪১৮টি হলেও ডিটিসিএর জরিপে বর্তমানে কার্যকর বা সচল পাওয়া গেছে মাত্র ৯৮টি রুট। এই বাস্তব পরিস্থিতিকে সামনে রেখে বিদ্যমান রুটগুলোকে পুনর্বিন্যাস করে একটি সমন্বিত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

ডিটিসিএর রুট রেশনালাইজেশন গবেষণায় যাত্রী ও যানবাহনের ওপর ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ৯৮টি রুটে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর boarding-alighting survey এবং প্রায় ৩৫–৩৬ হাজার যাত্রীর origin-destination survey করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত যানবাহন গণনা এবং প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলগত চিত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। 

কীভাবে কাজ করবে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা?

প্রস্তাবিত ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে একটি নির্দিষ্ট রুটে একাধিক কোম্পানি যাত্রী ধরার জন্য প্রতিযোগিতা করবে না। বরং সংশ্লিষ্ট রুটের জন্য একটি নির্দিষ্ট অপারেটিং কোম্পানি/কোম্পানি কাঠামো থাকবে।

পরিকল্পনায় প্রতিটি রুটের জন্য—

কতটি বাস প্রয়োজন;

কোন কোম্পানি বা কোম্পানি কাঠামো বাস পরিচালনা করবে;

কোথায় কাউন্টার থাকবে;

কোথায় বাসের ডিপো থাকবে;

কোথায় layover/পার্কিং হবে;

কী ধরনের বাস চলবে;

বাসের ন্যূনতম মান ও স্পেসিফিকেশন কী হবে

এসব নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। 

এর ফলে বর্তমানে দেখা যাওয়া একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাসের অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, যাত্রী ওঠানোর জন্য হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে থামা এবং নির্দিষ্ট সময়সূচির অভাব কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কেন এই পরিবর্তন প্রয়োজন?

বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক বাস মালিক পৃথকভাবে এক বা একাধিক বাস পরিচালনা করেন এবং একই করিডোরে বিভিন্ন কোম্পানির বাস প্রতিযোগিতা করে। এই প্রতিযোগিতার অন্যতম ফল হিসেবে রাস্তায় বাসের অতিরিক্ত জটলা, যাত্রী ওঠানো-নামানোর সময় অনিয়ম এবং সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সরকারের রুট রেশনালাইজেশন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাসের সংখ্যা প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা এবং একই রুটে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমানো। ডিটিসিএ জানিয়েছে, কোনো রুটে যদি যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী ৬০টি বাস প্রয়োজন হয় অথচ সেখানে ১০০টি বাস চলাচল করে, তাহলে অতিরিক্ত বাস এবং অযোগ্য/জীর্ণ যানবাহন সরিয়ে দেওয়া হবে। 

৩২টি প্রস্তাবিত রুটে যুক্ত হবে ঢাকার প্রধান পরিবহন কেন্দ্র

প্রস্তাবিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিমানবন্দর, গাবতলী, মহাখালী, কুড়িল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, সদরঘাট, কাঁচপুর, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর ও কেরানীগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে একটি সমন্বিত বাস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

প্রকাশিত প্রাথমিক তালিকায় রয়েছে—

নন্দন পার্ক–ডেমরা

নন্দন পার্ক–কাঁচপুর

দিয়াবাড়ী–সদরঘাট

শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির

কোনাবাড়ী–কেরানীগঞ্জ

গাবতলী–শিমুলতলী

ঘাটারচর–সালনা

নবীনগর–বাবুবাজার

সাভার–কাঁচপুর

গাবতলী–ডেমরা

গাবতলী–কুড়িল

কাঁচপুর–গাজীপুর

সাভার–আড়াইহাজারসহ আরও কয়েকটি রুট। 

তবে এগুলোকে চূড়ান্ত রুট তালিকা হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। ডিটিসিএর কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনার পর রুটের পরিবর্তন বা সংশোধন হতে পারে। 

প্রথম ধাপে কয়েকটি রুটে পাইলট প্রকল্প

আগস্টে প্রকাশিত পরিকল্পনায় ডিটিসিএ জানিয়েছিল, প্রাথমিকভাবে দুই বা তিনটি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা শুরু করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। কোন রুটে আগে শুরু হবে, তা যাত্রী চাহিদা, সড়কের অবস্থা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং বাস মালিকদের অংশগ্রহণের মতো বিষয় বিবেচনা করে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। 

অন্যদিকে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ডিটিসিএ পাঁচটি রুটকে ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব রুট নির্বাচন করা হয়েছে যাত্রী চাহিদা, বাসের প্রাপ্যতা, সড়কের অবস্থা এবং বিদ্যমান অপারেটর কাঠামো বিবেচনায়। 

পাঁচটি রুটে ৫২ আসনের আধুনিক বাসের প্রস্তাব

প্রস্তাবিত ৩২ রুটের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে প্রাথমিকভাবে ১২ মিটার দীর্ঘ ও ৫২ আসনের বাস চালুর কথা বলা হয়েছে।

রুটগুলো হলো—

রুট ২১এ: বেরাইদ–খিলগাঁও রেলগেট

রুট ১এ: তালতলা–সদরঘাট

রুট ২৭এ: কাঁচপুর–গাজীপুর চৌরাস্তা

রুট ৫: নন্দন পার্ক/জিরানি–ডেমরা

রুট ৪: শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির। 

এর মধ্যে বেরাইদ–খিলগাঁও রেলগেট করিডোরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯.৫৮ কিলোমিটার এবং দৈনিক যাত্রী চাহিদা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ৮৭৮ জন বলে ডিটিসিএর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

২৫টি সার্কুলার রুটও আসছে

৩২টি প্রধান রুটের পাশাপাশি স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য ২৫টি সার্কুলার/ফিডার রুট চালুর প্রস্তাব রয়েছে।

এর একটি উদ্দেশ্য হলো প্রধান বাস রুট ও মেট্রোরেলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা এবং বড় সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরতা কমানো। তবে এ ব্যবস্থার আগে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট চালকদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হয়েছে। 

বাস মালিক ও শ্রমিকদের কী হবে?

‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বর্তমান বাস মালিক ও শ্রমিকদের নতুন কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা।

৩০ সেপ্টেম্বর ডিটিসিএ বাস মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে এ বিষয়ে মতবিনিময় করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে মালিকদের বাসের তালিকা যাচাই, গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা এবং যোগ্য যানবাহনকে নির্ধারিত কাউন্টার থেকে পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

এখানে সরকারের উদ্দেশ্য শুধু পুরোনো বাস কোম্পানি বন্ধ করা নয়; বরং বিচ্ছিন্ন মালিকানাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অপারেটিং কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা—এটাই মূল বিষয়।

ফিটনেসবিহীন বাস অপসারণের উদ্যোগ

রুট রেশনালাইজেশনের সঙ্গে বাসের মান নিয়েও কঠোর হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে ডিটিসিএর বৈঠকে ঢাকার সড়ক থেকে এক হাজারের বেশি ফিটনেসবিহীন বাস অপসারণের সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসে। 

ফলে নতুন ব্যবস্থা চালু হলে শুধু রুট পরিবর্তন নয়, বাসের ফিটনেস, কাগজপত্র, নিরাপত্তা ও নির্ধারিত সংখ্যার বিষয়েও নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হলে একজন সাধারণ যাত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে—

১. একই রুটে বাসের অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা কমবে।

২. নির্দিষ্ট কাউন্টার ও স্টপেজ তৈরি হতে পারে।

৩. বাসের সংখ্যা যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।

৪. অপেক্ষার সময় ও বাসের ব্যবধান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।

৫. তুলনামূলক আধুনিক ও নির্দিষ্ট মানের বাস চালুর সুযোগ তৈরি হবে।

৬. চালক ও পরিবহন কোম্পানিকে জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হবে।

৭. মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব হবে।


তবে এগুলো পরিকল্পনার সম্ভাব্য সুফল—এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত ফলাফল নয়

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়

তথ্য যাচাই করে স্পষ্ট হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া “ঢাকার ৯৮ বাস রুট কমে ৩২ হবে” 

বাস্তবে—

> ৯৮টি বর্তমানে সচল রুটের ওপর ভিত্তি করে ৩২টি প্রধান ফ্র্যাঞ্চাইজি রুটের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এখনো মালিক-শ্রমিকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, রুট চূড়ান্তকরণ, অপারেটিং কোম্পানি নির্ধারণ, বাস যাচাই, ডিপো-কাউন্টার নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরির কাজ রয়েছে। ডিটিসিএ নিজেই জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ৩২টি রুট পরিবর্তিত হতে পারে। 

সরকারি পর্যায়ে এর ভিত্তিও নতুন নয়। ২০২১ সালে ডিটিসিএ বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার concept design ও implementation plan তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সেই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল যাত্রী চাহিদার ভিত্তিতে রুট পুনর্বিন্যাস, বাস ফ্লিটের পরিকল্পনা, বাস-স্টপ/ডিপো এবং কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা ব্যবস্থা তৈরি করা। 

বিশ্লেষণ

ঢাকার গণপরিবহনে এটি বাস্তবায়িত হলে এটি কেবল বাসের রুট কমানোর প্রকল্প হবে না; বরং ব্যক্তিমালিকানাভিত্তিক বিচ্ছিন্ন বাস পরিচালনা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক, রুটভিত্তিক ও ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনায় যাওয়ার একটি কাঠামোগত পরিবর্তন হবে।

তবে সফলতার জন্য তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাস মালিক ও শ্রমিকদের কার্যকর অন্তর্ভুক্তি, যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী বাসের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের পর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি। শুধু রুট ৯৮ থেকে ৩২-এ নামিয়ে আনলেই যানজট বা যাত্রী ভোগান্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হবে না।

সর্বশেষ