*মোংলা বন্দর ঘিরে অর্থনীতির নতুন স্বপ্ন, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।*
*উপশিরোনাম:* ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণচুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা | ড্রেজিং, রেল-সড়ক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে বাড়বে বিনিয়োগের সুযোগ।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর মোংলাকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা নতুন করে সামনে এসেছে। বন্দরটির আধুনিকায়ন, কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন এবং বহুমাত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে ঘিরে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মোংলা বন্দরের ভূমিকা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বড় অঙ্কের ঋণচুক্তি এ সম্ভাবনাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তবে বন্দরটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে নাব্যতা সংকট, যোগাযোগ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিকল্পিত শিল্পায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। বন্দরটির কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ক্ষেত্রে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে বন্দর চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে তুলনামূলক বেশি ড্রাফটের পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বর্তমানে নাব্যতাসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা বড় জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অন্যতম বিবেচ্য বিষয়। এ সমস্যার কার্যকর সমাধান হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বন্দরের বাণিজ্যিক সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
*চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ*
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ অবস্থায় মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিকল্প সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটির ওপর চাপ কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে শুধু জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না। পণ্য খালাসের গতি, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, গুদাম সুবিধা এবং দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
মোংলা বন্দরকে ঘিরে পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও হিমায়িত চিংড়িসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বন্দরটির ব্যবহার বাড়ানো গেলে পরিবহন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
*সড়ক-রেল ও বিমান যোগাযোগে গুরুত্ব*
বন্দরটির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সড়ক, রেল ও আকাশপথের সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খুলনা-মোংলা সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, খুলনা-ভাঙ্গা সংযোগ সড়কের উন্নয়ন এবং কনটেইনার ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন সহজ হতে পারে।
এ ছাড়া খান জাহান আলী বিমানবন্দর চালুর বিষয়টিও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় রয়েছে। বিমানবন্দরটি চালু করা সম্ভব হলে ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের যাতায়াতে সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিচালনাগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি।
মোংলা বন্দরসংলগ্ন প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) বাস্তবায়িত হলে শিল্পকারখানা, গুদাম, লজিস্টিকস সেবা এবং রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্দরকেন্দ্রিক নতুন ব্যবসা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
*প্রধানমন্ত্রীর সফরে উন্নয়ন প্রত্যাশা*
গত ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটি ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন। এ সময় বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় নাব্যতা নিশ্চিত করাসহ সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. সালাহ্ উদ্দিন কবির জানান, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নাব্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পরে তিনি প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, চ্যানেলে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বাড়ানো সম্ভব হলে বেশি ড্রাফটের জাহাজ বন্দরে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মোংলা বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও শক্তিশালী হতে পারে।
*বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আশাবাদ*
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকর আলী বলেন, মোংলা বন্দরের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ ত্বরান্বিত করবে বলে তিনি আশা করেন। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য চ্যানেলের নাব্যতা উন্নয়নে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানো মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার ক্ষেত্র তৈরিতেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
*সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ*
মোংলা বন্দরকে ঘিরে বিনিয়োগ ও উন্নয়নের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা। শুধু ঋণচুক্তি বা উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে বন্দরটি কতটা সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিবেচনায় রেখে বলা যায়, মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনার সুফল পেতে নাব্যতা, যোগাযোগ, শুল্ক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, মোংলা বন্দরকে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং তার সুফল কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছায় ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের কাছে।
মতামত দিন