*চায়ের কাপে চেতনানাশক, অচেতন চালক; টাকা দিলেই ফেরত সিএনজি*
*উপশিরোনাম* :
যাত্রীবেশে চালককে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ চক্র, চায়ে ওষুধ মিশিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেয় গাড়ি ও মোবাইল—পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ৬
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে যাত্রীবেশে ঘুরছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের লক্ষ্য যাত্রী নয়, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে চালককে একা পেলেই শুরু হয় কথাবার্তা। ভাড়ার কথা বলে তৈরি করা হয় বিশ্বাস। সুযোগ বুঝে চায়ের কাপে মেশানো হয় চেতনানাশক ওষুধ।
কিছুক্ষণ পর চালক যখন অচেতন হয়ে পড়েন, তখন তাঁর মোবাইল ফোন ও অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় চক্রের সদস্যরা। এরপর চালককে কখনো হাসপাতালে, কখনো গ্যারেজে নেওয়া হয়; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাস্তায় ফেলে রেখেই অটোরিকশা নিয়ে সরে যায় তারা।
চুরি করা গাড়ি বিক্রি না করে মালিকের কাছেই ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। তদন্তে এমন একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পুলিশের ভাষ্য, রাজধানীতে এ ধরনের অন্তত দুটি চক্র সক্রিয় রয়েছে।
এর মধ্যে একটি চক্রের নেতৃত্বে জামাল মেম্বার এবং অন্যটির নেতৃত্বে অলি নামের এক ব্যক্তি। দুই চক্রে নিয়মিত সদস্য রয়েছে অন্তত ১৪ জন।
সম্প্রতি বাড্ডা এলাকায় অটোরিকশা চুরির সময় জামাল ও তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে ডিবির লালবাগ বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দল। গত ৬ আগস্ট জামালকে প্রধান আসামি করে পল্টন থানায় মামলা করা হয়।
মামলায় জামালের সহযোগী হিসেবে লিটন সরদার, মান্নান খাঁ, আব্দুল করিম, লাভলু মাতব্বর ও ইউনূসের নাম রয়েছে।
*যেভাবে ফাঁদে পড়েন চালক*
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রের সদস্যরা সাধারণত সকালে দলবদ্ধ হয়ে বের হন। সঙ্গে থাকে জামালের নিজস্ব সিএনজি অটোরিকশা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তারা এমন চালক খোঁজেন, যিনি রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে একা বসে আছেন।
চালক চা নিয়ে বসার পর চক্রের একজন সদস্য যাত্রী সেজে তাঁর কাছে যান। কোথায় যাবেন, কত ভাড়া—এসব নিয়ে শুরু হয় স্বাভাবিক কথাবার্তা। চালকের মনোযোগ যখন ভাড়া নিয়ে আলোচনায়, তখন অন্য একজন গোপনে তাঁর চায়ের কাপে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দেন বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ওই সদস্যও চালকের সঙ্গে চা পান করেন। পরে চালককে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় ওঠেন।
কিছুদূর যাওয়ার পর ওষুধের প্রভাবে চালক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে অচেতন অবস্থায় নিয়ন্ত্রণে নেয় চক্রটি। এরপর অটোরিকশা ও চালকের মোবাইল ফোন নিজেদের দখলে নেয় তারা।
চালকের অবস্থা গুরুতর হলে কখনো হাসপাতালে নেওয়া হয়, আবার কখনো গ্যারেজে নিয়ে রাখা হয়। কোনো কোনো ঘটনায় অসুস্থ চালককে রাস্তায় ফেলে রেখেও অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
*গাড়ি ফেরাতে দিতে হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা*
চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই এরপর যোগাযোগ করা হয় অটোরিকশার মালিকের সঙ্গে। বলা হয়, টাকা দিলে গাড়ি ফেরত পাওয়া যাবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা পৌঁছে দিলে নির্দিষ্ট স্থানে অটোরিকশা রেখে যায় চক্রের সদস্যরা।
তবে সব ক্ষেত্রে দাবির পরিমাণ একই ছিল না। সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় চালক মোহাম্মদ মিলনের অটোরিকশা ফেরত দিতে ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
রংপুর থেকে প্রায় এক দশক আগে ঢাকায় আসা মিলন অটোরিকশা চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। তাঁর ভাষ্য, কাঁঠালবাগান এলাকায় একটি চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়ার সময় এক ব্যক্তি যাত্রী পরিচয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। পরে ওয়ারী যাওয়ার জন্য ভাড়া ঠিক হয়।
চা পান করার কিছুক্ষণ পরই তাঁর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। মাথা ঝিমঝিম করার পর ধীরে ধীরে তিনি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
মলনের ভাষায়, পরে শেরাটনের সামনে গিয়ে আর কিছু মনে নেই। দুই দিন পর তাঁর জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারেন, তাঁর অটোরিকশা নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
তাঁর ধারণা, চায়ের সঙ্গে কোনো ধরনের চেতনানাশক বা ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছিল।
*৫৫ হাজার টাকা দিয়ে ফিরেছিল আরেক সিএনজি*
একই চক্রের হাতে অটোরিকশা হারানো আরেক চালক খলিলের গাড়ি ফেরানোর ঘটনায় যুক্ত ছিলেন শাকিল নামের এক মেকানিক।
শাকিলের ভাষ্য, খলিলকে অচেতন অবস্থায় কাকরাইল এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে গাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দাবি করে চক্রটি।
শেষ পর্যন্ত ৫৫ হাজার টাকা নিয়ে শনির আখড়া ব্রিজের ওপারে যেতে হয় তাঁদের। সেখানে টাকা দেওয়ার পর অটোরিকশাটি ফেরত দেওয়া হয়।
শাকিলের দাবি, টাকা গ্রহণের সময় জামাল নিজেই সেখানে ছিলেন।
*অভিযোগ না করাই চক্রের বড় সুযোগ*
ডিবির তদন্তে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে—এ ধরনের ঘটনায় অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে অপরাধীরা দীর্ঘদিন একই কৌশলে কাজ করার সুযোগ পায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনি প্রক্রিয়াকে সময়সাপেক্ষ ও ঝামেলাপূর্ণ মনে করায় অনেকে মামলা না করে টাকা দিয়ে গাড়ি ফিরিয়ে নেওয়াকেই সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেন।
এ ধরনের ঘটনায় অন্তত চারজন চালক ও গাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
*চেতনানাশক ওষুধ নিয়েও উদ্বেগ*
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, চায়ের সঙ্গে যে ওষুধ ব্যবহার করা হতো, তা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ওষুধ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ সংগ্রহ ও সেবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনগতভাবেও নিয়ন্ত্রিত।
ডিবির গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দলের অতিরিক্ত উপকমিশনার এনায়েত কবীর সোয়েব বলেন, চক্রটির কর্মকাণ্ড শুধু গাড়ি চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; চালককে অচেতন করে ফেলার কারণে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ সময় অচেতন থাকলে ভুক্তভোগীর শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্ঞান ফেরার আশঙ্কাও থাকে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রটির কর্মকাণ্ডের আরও তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
*বাইরে ‘পরোপকারী’, ঢাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধী*
তদন্তে উঠে এসেছে জামালের দ্বৈত পরিচয়ের বিষয়টিও। গ্রামের বাড়িতে তিনি স্থানীয়দের কাছে জনপ্রতিনিধি ও পরোপকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে প্রতিবেশীদের ভাষ্য।
এক প্রতিবেশী জানান, আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনের সময় জামালকে অর্থসহায়তা করতে দেখা গেছে। ঈদের সময় দরিদ্র মানুষের মধ্যে পোশাক ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করতেন বলেও জানান তিনি।
তবে গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে রাজধানীতে তাঁর আরেকটি পরিচয় সামনে এসেছে—একটি সংঘবদ্ধ অটোরিকশা চক্রের নিয়ন্ত্রক।
*যে যার দায়িত্বে, ভাগও নির্ধারিত*
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, চক্রের প্রত্যেক সদস্যের কাজ আলাদা ছিল। জামাল চালকদের শনাক্ত করতে নিজের সিএনজি ব্যবহার করতেন এবং সদস্যদের দৈনিক খরচ হিসেবে প্রায় ৫০০ টাকা দিতেন।
একটি অটোরিকশা থেকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আদায় হলে বড় অংশটি জামালের হাতে যেত বলে তদন্তে জানা গেছে।
লাভলু মাতুব্বর সদস্যদের বহনে ব্যবহৃত সিএনজি চালানোর জন্য পেতেন ২ হাজার ৫০০ টাকা। লিটন সরদার চালকের সঙ্গে কথাবার্তা ও চায়ে ওষুধ মেশানোর কাজে পেতেন ৫ হাজার টাকা।
ভাড়া ঠিক করার দায়িত্বে থাকা স্বপন পেতেন ৬ হাজার টাকা। আর চালকের মোবাইল ফোন ও অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ইউসুফ মৃধার ভাগ ছিল ৬ হাজার টাকা।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, জামালসহ চক্রের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে আগের বিভিন্ন মামলাও রয়েছে। পুলিশি নথি অনুযায়ী, জামালের বিরুদ্ধে মাদকসহ আটটি মামলা রয়েছে। মান্নান খাঁর বিরুদ্ধে সাতটি, লিটন সরদারের বিরুদ্ধে তিনটি, আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে দুটি এবং লাভলু মাতুব্বরের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।
*আরও বড় অভিযান আসছে*
ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, গাড়ি চুরি ও সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ টিম নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।
তিনি জানান, জামালের চক্রকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজধানীতে যানবাহন চুরির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
চায়ের দোকানে কয়েক মিনিটের অসতর্কতাই যে একজন চালকের জীবনের বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, জামালের চক্রের কর্মকাণ্ড সেই আশঙ্কাই সামনে এনেছে। একই সঙ্গে গাড়ি ফেরত পেতে চাঁদার মতো টাকা দেওয়ার প্রবণতা এ ধরনের অপরাধকে আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
মতামত দিন