*বাংলাদেশে ৬৩৫ কোটি ডলার ঢালতে চায় জাপান!
*উপশিরোনাম:* গাড়ি উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় গুরুত্ব; পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের পরিকল্পনা; চীনের প্রভাব মোকাবিলাও কৌশলগত বিবেচনায়।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৬৩৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে জাপান। গাড়ি উৎপাদন, অন্যান্য শিল্পকারখানা স্থাপন এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে এ বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যয় হতে পারে। এ নিয়ে চলতি মাসেই দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে জাপানের অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতেও জাপান এ উদ্যোগ নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ অক্টোবর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক-পরবর্তী যৌথ বিবৃতিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিষয়টি স্থান পেতে পারে বলে নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
*শিল্প ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা*
জাপানের সম্ভাব্য বিনিয়োগের অন্যতম লক্ষ্য বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্পের বিকাশ। বিশেষ করে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন, অন্যান্য শিল্পকারখানা স্থাপন এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনও (বিএসইজেড) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জাপানের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, প্রকল্পের ধরন এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে তার সংযোগের ওপর।
এদিকে, জাপানি কোম্পানিগুলোর একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল শিগগির বাংলাদেশ সফর করতে পারে। দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অর্থনীতি ও বিনিয়োগবিষয়ক সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
*চীনের প্রভাবের বিপরীতে জাপানের কৌশল*
বাংলাদেশের আমদানিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যেও দেশটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিসর সম্প্রসারণের পাশাপাশি চীনের প্রভাব মোকাবিলাও জাপানের এই উদ্যোগের অন্যতম কৌশলগত বিবেচনা।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার সুযোগ খুঁজছে জাপান। তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, অবকাঠামোগত সক্ষমতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর।
*বিনিয়োগে বাংলাদেশের সম্ভাবনা*
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ একদিকে যেমন বড় ভোক্তা বাজার, অন্যদিকে তেমনি উৎপাদনশিল্প সম্প্রসারণেরও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে আসছে জাপান। এবার সেই সহযোগিতার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে সরাসরি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ সফল হলে দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোরও সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ, খাতভিত্তিক বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত পুরো পরিকল্পনাটিকে সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
সূত্র: নিক্কেই এশিয়া।
মতামত দিন